দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
ইইডির দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ
- দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- মনিরুজ্জামান মনি ও আবু সাঈদ আকন্দের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে
- অভিযোগ তদন্তে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, পদোন্নতি এবং বদলি নিয়ে প্রভাব বিস্তারের দাবি।
তদন্তের আওতায় থাকা দুই কর্মকর্তা হলেন—ঢাকা মেট্রোর সাবেক সহকারী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনি ও ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন-৩ শাখার উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানের বুধবার (২৮ অক্টোবর) সই করা অফিস আদেশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ইইডির সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনি ও সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাঈদ আকন্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদসহ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শিমুল আকন্দের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে অভিযোগ
তদন্তের মুখে থাকা আবু সাঈদ আকন্দ শিমুল আকন্দ নামে পরিচিত। তিনি বর্তমানে ডিপ্লোমা প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য তিনি। ৫ আগস্টের আগে নিজেকে আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন অভিযোগের পর গত ৩০ জুলাই প্রধান কার্যালয় থেকে তাঁকে রংপুরে বদলি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রায় দুই মাস পর, গত ৮ অক্টোবর তদবিরের মাধ্যমে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ওই অঞ্চলে তিনি উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের ভাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মা কনস্ট্রাকশনকে’ কাজ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রাখতেন তিনি। কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই কৌশলে বিল তুলে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
শিমুল আকন্দের পদোন্নতি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওই তালিকায় শিমুল আকন্দের অবস্থান ছিল ২৩তম।
অভিযোগ অনুযায়ী, পদ শূন্য না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পরে কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে পদায়ন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ
ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে দীর্ঘদিন সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে ঢাকার বাড্ডার রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদ্রাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে দুই ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নেওয়ার পর অন্য একজন আট লাখ টাকা দেওয়ায় দ্বিতীয় ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।
গত ১৩ আগস্ট ঘুষ দিয়েও কাজ না পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরে তদন্ত থেমে যায় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ প্রত্যাহার করানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘুষের অভিযোগ ওঠার পর মনিরুজ্জামান মনিকে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি করা হয়। প্রতিবেদনে বদলিটিকে ‘শাস্তিমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে নতুন কর্মস্থলে যোগদান নিয়ে তিনি শুরু থেকেই গড়িমসি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেখানে নামমাত্র যোগদান করলেও ঢাকায় ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বদলি নিয়ে ডিও লেটার সংগ্রহের অভিযোগ
ঢাকায় ‘লাভজনক’ পদে ফিরতে মনিরুজ্জামান মনি একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের আধা-সরকারি পত্র বা ডিও লেটার সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই চিঠিতে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য মনিরুজ্জামান মনিকে ‘বিএনপিপন্থি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দুটি ডিও লেটারের ভাষা হুবহু একই বলেও দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহান বলেন, “ওই দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশের ফলে দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। তবে তদন্তের ফলাফল, অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এখনো প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সম্পাদকীয় সতর্কতা: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্নীতি, ঘুষ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা তদন্তের চূড়ান্ত ফল ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
//ডিবিটেক/এসআইআই/এসএমপি/এমআইএসটি//





