তৃতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব ৪,০১৭ কোটি টাকা

প্রবৃদ্ধিতে ফিরল গ্রামীণফোন

  • গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ০.২ শতাংশ
  • মোট গ্রাহক ৮ কোটি ৬৮ লাখ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৫ কোটি ৩০ লাখ
  • নিট মুনাফা ৭৫১ কোটি টাকা, ডেটা ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ

প্রবৃদ্ধিতে ফিরল গ্রামীণফোন
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৩১  

নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, গ্রাহক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ডেটা ব্যবহারের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে গ্রামীণফোন। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.২ শতাংশ এবং আগের প্রান্তিকের তুলনায় ০.৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডেটা ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। প্রান্তিক শেষে অপারেটরটির মোট গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৬৮ লাখে, যার মধ্যে ৫ কোটি ৩০ লাখ বা ৬১.৪ শতাংশ ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন।

গ্রামীণফোনের এই প্রবৃদ্ধি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আগের কয়েকটি প্রান্তিকে রাজস্বের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাহক ধরে রাখার সক্ষমতা, ডেটা সেবায় সম্পৃক্ততা এবং ভয়েস কলের মিনিট ব্যবহারের ইতিবাচক ধারা রাজস্ব পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন দক্ষতা বজায় রেখে নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে কোম্পানিটি।

গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান বলেন, “এই প্রান্তিকে আমাদের পারফরম্যান্স, আমরা যে ভারসাম্যটি তৈরির কাজ করছি তারই প্রতিফলন: প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসা, মুনাফা সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা।”

তিনি জানান, তৃতীয় প্রান্তিকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.২ শতাংশ এবং পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় ০.৯ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। গ্রাহকভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি ডেটা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ঈদের ব্যস্ত সময়ের পরও ডেটা ব্যবহারের চাহিদা স্থিতিশীল ছিল।

ইয়াসির আজমান বলেন, প্রবৃদ্ধির এই ধারা টেকসই করাই এখন কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য। গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সেবার প্রস্তাব ও প্যাকেজের সামঞ্জস্য বাড়ানো, ডেটা ব্যবহারে সম্পৃক্ততা গভীর করা এবং কম্বো প্যাকের ব্যবহার সম্প্রসারণে কাজ চলবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পরিচালন দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নেটওয়ার্কের গুণগত মান ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নয়নে বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধনের আগের আয় (ইবিআইটিডিএ) মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং মার্জিন প্রায় ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত মূলধনি ব্যয় ও বিক্রয়ের অনুপাত (ক্যাপেক্স-টু-সেলস) ছিল ১২.৩ শতাংশ। এ বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে ফোরজি নেটওয়ার্ক ও ফাইবার সংযোগ সম্প্রসারণ এবং ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম চালুর কাজে।

ইয়াসির আজমানের ভাষ্য, নেটওয়ার্ক, স্পেকট্রাম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সংযোগ চাহিদা পূরণে কাজ করছে গ্রামীণফোন। দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি গ্রাহক অভিজ্ঞতার উন্নতি ঘটায়—এমন বিনিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এআই ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে জোর

প্রযুক্তি অবকাঠামো সহজ করা, সেবার পোর্টফোলিও আরও সুনির্দিষ্ট করা এবং গ্রাহকদের সেবা গ্রহণের জটিলতা কমানোর উদ্যোগও এগিয়ে নিচ্ছে গ্রামীণফোন। ভবিষ্যতে কার্যক্রম পরিচালনা ও গ্রাহকসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন ইয়াসির আজমান।

তিনি বলেন, এআই ও অটোমেশন বাস্তবায়নের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর সুফলও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে ‘ডিজিটাল ইনক্লুশন ফর মার্জিনালাইজড কমিউনিটিস’ উদ্যোগের দ্বিতীয় পর্যায় চালু করেছে গ্রামীণফোন। এ পর্যায়ে আটটি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ৪০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ৭০ শতাংশই নারী।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই-সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেও চালু করা হয়েছে ‘ওয়ানএআই স্টুডেন্ট প্যাক’। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এআই টুল সম্পর্কে জানতে, পড়াশোনায় সেগুলো ব্যবহার করতে এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তুলতে পারবেন।

ইয়াসির আজমান আরও বলেন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি পরিবেশগত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং তাৎক্ষণিক সংকটের মুখে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সামনে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা, এআই ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই হবে কোম্পানির অগ্রাধিকার।

ব্যয় নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীল মুনাফা

গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অটো মাগনে রিসব্যাক বলেন, আগের কয়েকটি প্রান্তিকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর তৃতীয় প্রান্তিকে রাজস্বে ইতিবাচক ধারা ফিরেছে। গ্রাহকসংখ্যা ও সেবা ব্যবহারের উন্নতি এখন রাজস্বে প্রতিফলিত হচ্ছে। বড় গ্রাহকভিত্তি, ডিজিটাল ও ডেটা সেবার শক্তিশালী পারফরম্যান্স এবং ভয়েস কলের মিনিট ব্যবহারের উন্নতি এ প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।

তিনি জানান, চতুর্থ প্রান্তিকে এই গতি কাজে লাগিয়ে আরও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় কোম্পানিটি। গ্রাহকভিত্তি বেড়ে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। গ্রাহক ঝরে পড়ার হার কম থাকা এবং নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ায় ডেটা ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেখা যাওয়া ইতিবাচক প্রবণতা বজায় রেখে তৃতীয় প্রান্তিকে ডেটা ব্যবহার প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

অটো মাগনে রিসব্যাকের তথ্যমতে, তৃতীয় প্রান্তিকে পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.২ শতাংশ কমেছে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনার ফলে আগের কয়েকটি প্রান্তিকে নেতিবাচক প্রবণতার পর নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে ৭৫১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকটের কারণে চতুর্থ প্রান্তিকে ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে।

কোম্পানিটির মূলধন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও ইতিবাচক তথ্য দিয়েছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সুশৃঙ্খল মূলধন বণ্টন ও বিনিয়োগ অবচয় ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখছে। মূলধন নিয়োজিত সম্পদের বিপরীতে মুনাফার হার (আরওসিই) এক বছরের ব্যবধানে ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ২৬.৬ শতাংশ হয়েছে বলে তিনি জানান।

গ্রামীণফোনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে প্রত্যাবর্তন, ডেটা ব্যবহার বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে বিনিয়োগ—এই চারটি বিষয় আগামী প্রান্তিকগুলোতে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

//ডিবিটেক/এমএমজিপি/এসএমই/এমভিএনও//