কপ১৭-তে বাংলাদেশের আহ্বান

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর চায় বাংলাদেশ

  • জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চেয়েছে বাংলাদেশ
  • ২০৩১ সালের মধ্যে ২৫ কোটি নতুন গাছ লাগানো ও পরিচর্যার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার
  • জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক তথ্য, পরিবীক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর চায় বাংলাদেশ
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৫১  

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজে পাওয়া যায় এমন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

দেশের স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলাশয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে প্রায় ১৪ হাজার বৈচিত্র্যময় প্রজাতি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ এসব প্রজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে উন্নত দেশগুলোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জরুরি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ।

২৮ অক্টোবর, বুধবার, আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষসমূহের ১৭তম সম্মেলন (সিবিডি কপ১৭) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম এ আহ্বান জানান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইয়েরেভানের আরাগাৎস প্লেনারি হলে বাংলাদেশের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দেশের জীববৈচিত্র্যের অবস্থা, সংরক্ষণ উদ্যোগ এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।

জীববৈচিত্র্যের ওপর বাড়ছে চাপ

ড. ফাহমিদা খানম জানান, বাংলাদেশের স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলাশয় এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে প্রায় ১৪ হাজার বৈচিত্র্যময় প্রজাতি রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, ম্যানগ্রোভ বন ও জলাভূমির অবক্ষয় সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এসব সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করছে।

জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ও ২৫ কোটি গাছ

কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো বাস্তবায়নে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ কাঠামোর আলোকে দেশটি ২৩টি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা জমা দিয়েছে, যার আওতায় রয়েছে ১০৭টি কার্যক্রম।

এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনা প্রণয়নে জীববৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নেওয়া, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংরক্ষিত এলাকা ও অন্যান্য কার্যকর এলাকাভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি শনাক্ত করা।

ড. ফাহমিদা খানম আরও জানান, বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক পদ্ধতিতে ২০৩১ সালের মধ্যে ২৫ কোটি নতুন গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি। এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জলবায়ু এবং মানুষের কল্যাণে অবদান রাখবে।

তিনি উল্লেখ করেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে জলবায়ু সহনশীলতা, ভূমির অবক্ষয় রোধ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই এসব ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জিনগত সম্পদ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে নাগোয়া প্রটোকল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সরকারি সমন্বয়ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং পুনর্বিন্যাস করছে।

জিনগত সম্পদসংক্রান্ত ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য (ডিএসআই) ও সিনথেটিক বায়োলজিসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ে দক্ষতার ঘাটতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ।

সহজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি

জীববৈচিত্র্য সনদের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে উন্নত দেশগুলোর প্রতি অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশেষভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক তথ্য উৎপাদন, পরিবীক্ষণ কাঠামো বাস্তবায়ন, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলধারায় জীববৈচিত্র্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অর্থায়ন পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অর্থায়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূমির অবক্ষয় রোধ এবং জলবায়ু কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। বহুপক্ষীয় পরিবেশ চুক্তিগুলোর পরিবীক্ষণ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থার মধ্যেও সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

২০৫০ সালের অভিন্ন লক্ষ্য

ড. ফাহমিদা খানম বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি রয়েছে। ইয়েরেভান সম্মেলন আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়ার একটি কার্যকর মাইলফলক হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

//ডিবিটেক/আরটিএ/এমপিএন/এফইও//