কুয়াকাটায় দূষণের সূচক বেশি
শুঁটকিতে প্লাস্টিক কণা, খাদ্যনিরাপত্তায় উদ্বেগ
- চার উপকূলীয় এলাকার ২৪টি নমুনার সবগুলোতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত
- পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিস্টাইরিনের উপস্থিতি বেশি
- নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনে গবেষকদের পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ার সুপারিশ
বাংলাদেশের চার উপকূলীয় এলাকার শুঁটকির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে সংগ্রহ করা ছয় প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির ২৪টি নমুনার প্রতিটিতেই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্য খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের একটি সম্ভাব্য পথ হলো দূষিত মাছ ও তা থেকে তৈরি শুঁটকি।
বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বাধীন দল। গবেষণায় বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুথি যুক্ত ছিলেন। গবেষণাটি গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Marine Pollution Bulletin-এ প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার এলাকার ২৪টি নমুনায় দূষণের উপস্থিতি
গবেষকেরা শুঁটকি উৎপাদনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র—সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফ—থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। বহুল ব্যবহৃত ছয় প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির মধ্যে ছিল লইট্টা, পোয়া, ছুরি, ফাইস্যা, হরিণা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ি। চারটি এলাকা ও ছয় প্রজাতির সমন্বয়ে মোট ২৪টি নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় সব নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। এলাকাভিত্তিক তুলনায় কুয়াকাটার নমুনায় পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্সের মান সবচেয়ে বেশি—২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। এরপর রয়েছে কক্সবাজার, যেখানে সূচকের মান ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১।
গবেষণায় প্রায় নয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC) ও পলিস্টাইরিন (PS) বেশি পাওয়া গেছে। পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স বিভিন্ন পলিমারের সম্ভাব্য বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়। তবে সূচকের মানকে সরাসরি মানুষের রোগের ঝুঁকি বা শুঁটকির নিরাপত্তার চূড়ান্ত পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; এর ব্যাখ্যার জন্য গবেষণার পদ্ধতি ও অন্যান্য ফলাফলও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দূষণের উৎস নিয়ে গবেষকদের ব্যাখ্যা
অধ্যাপক আশরাফুল আজম খানের মতে, উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছানো পৌর, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যের প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব কণা জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করার পর মাছ থেকে তৈরি শুঁটকিতেও থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে মাছের লার্ভার আক্রমণ ও অপচয় ঠেকাতে কিছু শুঁটকি ব্যবসায়ী ডিডিটি ও নগভসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করতেন। তাঁর মতে, শুঁটকি উৎপাদনে রাসায়নিকের ব্যবহার এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ—দুটি বিষয়েই নজরদারি প্রয়োজন।
গবেষকেরা খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে এই গবেষণা থেকে শুঁটকি খাওয়ার কারণে মানুষের শরীরে কী মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে বা তার নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যপ্রভাব কী—তা নিশ্চিত করা যায় না। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগবেষণা প্রয়োজন।
নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনে সুপারিশ
শুঁটকি উৎপাদনকে আরও স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব করতে কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান। তাঁর সুপারিশ অনুযায়ী, খোলা ও দূষণপ্রবণ স্থানে মাছ না শুকিয়ে পরিষ্কার, নিয়ন্ত্রিত ও আচ্ছাদিত স্থানে অথবা উপযুক্ত সৌরশুকানোর ব্যবস্থায় শুঁটকি প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের শিট, কৃত্রিম দড়ি ও প্যাকেজিং উপকরণ থেকে কণা মাছের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় পৌর ও শিল্পবর্জ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার জোরদার করতে হবে, যাতে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে জলজ পরিবেশ দূষিত না করে।
গবেষকের মতে, ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শুঁটকি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ, নিয়মিত মান যাচাই এবং কার্যকর সরকারি নীতিমালা ও নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা এবং উপকূলীয় পরিবেশে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
//ডিবিটেক/এমভিআর/এসএমই/এমআইএসটি//





