কারিগরের নাম মুছে ফেলবেন না!
- নেপথ্যের কারিগরের স্বীকৃতি: জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মতো ঐতিহাসিক প্রকল্পের কনসেপচুয়াল আর্কিটেক্টের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের দাবি।
- টেলিকম ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্কার: ৭০০ মেগাহার্টজ গোল্ডেন স্পেক্ট্রাম উন্মুক্তকরণ এবং প্রফেসর ইউনূসের নির্দেশনায় তৈরি 'ন্যাশনাল সাইবার রেটিং সিস্টেম'-এর নেপথ্য বাস্তবায়নের ইতিহাস ও কৃতিত্বের অপলাপ।
- রিভার্স ব্রেইন ড্রেনের সংকট: মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলে দেশীয় ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা দেশের জন্য কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
- ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ক্ষতি: 'নাগরিক সেবা' এবং ইন্টারঅপারেবিলিটি প্রজেক্টে কারিগরি জ্ঞানহীন হস্তক্ষেপের কারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ও প্রকল্পের মূল দর্শন বিচ্যুতির আশঙ্কা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন হয়েছে। এই সময়োপযোগী ও ঐতিহাসিক উদ্যোগের জন্য মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু উদ্বোধনের আলোকচ্ছটায় একটি মুখ সেভাবে আলো পায়নি—যিনি এই জাদুঘরের কনসেপচুয়াল আর্কিটেক্ট (ভাবাগত স্থপতি)। এই স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দিতে যিনি দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, এমনকি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তিনি আড়ালেই রয়ে গেলেন। একজন স্থপতি বা পরিকল্পনাকার নিজের সৃষ্টিকে কতটা গভীরভাবে ধারণ করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। সৃষ্টির মূল কারিগরকে লাইমলাইটে বা সামনে না রাখাটা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। শিল্পের কারিগরকে যথাযথ সম্মান দিলে কারও সম্মান কমে না।
আমি জীবনের একটি বড় সময় বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে 'সলিউশন আর্কিটেক্ট' হিসেবে কাজ করেছি। তাই আমি জানি, একটি ভাবনা বা আইডিয়াকে কনসেপ্ট থেকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা একাকী লড়াইয়ের। আর সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে কৃতিত্বের জায়গায় যখন কেবল নীরবতা উপহার মেলে, তখন সেই কষ্টটা আর ব্যক্তিগত থাকে না; তা একটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সংকট হয়ে দাঁড়ায়।
আজ দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক অর্জনের কথা মনে পড়ছে—ফোরজি ও ফাইভজি সেবার জন্য ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করার সেই কঠিন প্রক্রিয়া। টেলিনর, আজিয়াটা ও রবির সাথে দফায় দফায় জটিল দরকষাকষি, অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে এই কাজের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব বোঝানো, তরঙ্গ ফি নিয়ে বার্গেইন করে তা পাস করিয়ে আনা, ছয় মাসের কাজকে রাতদিন এক করে ছয় সপ্তাহে নামিয়ে আনা, এবং আদালতের রিট খারিজ করাতে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে ক্রমাগত ছোটাছুটি (এমনকি ৭০০ মেগাহার্টজ ব্লক করে রাখা স্বার্থান্বেষী মহল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল)। এরপর পিটিডি ও বিটিআরসির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। সেই সময়ে গ্রামীণফোন যখন দুই হাজার তিনশত কোটি টাকার স্পেক্ট্রামে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে এলো, তখন আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হলো যে আমরা নাকি কাউকে বিশেষ সুবিধা (ফেভার) দিয়েছি। অথচ গত মাসে যখন এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সোনার হরিণের মতো সেই 'গোল্ডেন স্পেক্ট্রাম' উদ্বোধন হলো, যা 'ডিপ-ইনডোর' কভারেজ হিসেবে ফোরজি-ফাইভজি সেবার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল, তখন কেউ একটিবারও মনে করল না যে নেপথ্যের সেই মানুষগুলোর প্রতি একটি ছোট ধন্যবাদ অন্তত প্রাপ্য ছিল।
নির্বাচনী প্রস্তুতির সময় সাইবার যুদ্ধ, আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বিত এস্কেলেশন নিয়ে গঠিত একটি কোর কমিটির হয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময় নিয়মিত মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস স্যারকে ব্রিফ দিতাম। এক বৈঠকে স্যার নির্দেশ দিলেন, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সাইবার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য একটি রেটিং সিস্টেম বা মূল্যায়ন কাঠামো দাঁড় করাতে। স্যারের সেই নির্দেশনার আলোকেই আমরা একটি 'কোর স্কোরিং ও ওয়েটেড র্যাঙ্কিং' কাঠামো তৈরি করি। সেখানে চারটি প্রধান স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছিল: আইটি ও তথ্য-সুরক্ষা প্রশাসনের জন্য ২০ শতাংশ, অবকাঠামো ও অপারেশনসের জন্য ৩০ শতাংশ, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষার জন্য ৩০ শতাংশ, এবং ডিজিটাল সেবা ও ব্যবহারকারী পরিপক্বতার জন্য ২০ শতাংশ—যা পরিবর্তনযোগ্য (চেঞ্জেবল) একটি সেটআপ। আইসিটি বিভাগ থেকে বিসিসি এবং এনসিএসএ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই 'ন্যাশনাল রেটিং সিস্টেম' এর কাজ এগিয়ে নিয়েছিল এবং আমাদের প্রকৌশলীরা ইন-হাউজ এর সফল বাস্তবায়নও সম্পন্ন করেছিলেন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি আমার শেষ কর্মদিবসেই এটি উদ্বোধনের কথা ছিল, নোটিশও জারি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী প্রস্তুতি, হ্যান্ড-ওভার এবং 'নোট টু সাকসেসর লেটার' তৈরির চরম ব্যস্ততায় তা আর হয়ে ওঠেনি। গত সপ্তাহে যখন অবশেষে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হলো, তখন এই আইডিয়াটি কোথা থেকে এলো, কীভাবে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল—সেই সামান্যতম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিটুকুও দেওয়া হলো না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের 'টেলিকম কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS) বেঞ্চমার্কিং' ডিজাইন করা হয়েছিল, যা প্রায় ছত্রিশটি কেপিআই (KPI) সমৃদ্ধ। আপলিংক পারফরম্যান্স, মোবিলিটি, শহর-গ্রাম মিশ্র এলাকা এবং মহাসড়কের মতো বাস্তব ব্যবহারিক দৃশ্যপট প্রথমবারের মতো এই কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি এনটিটিএন (NTTN) ও আইএসপি (ISP)-দের জন্যও আলাদা কেপিআই বেঞ্চমার্কিং দাঁড় করানো হয়েছিল; কারণ মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মানে বাংলাদেশ তখন নব্বইটিরও বেশি দেশের পেছনে অবস্থান করছিল। এই কাজটির খবর গণমাধ্যমে এসেছে ঠিকই, কিন্তু যাঁরা এর নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন, তাঁদের নাম আসেনি। নিজের নাম বাদ পড়ুক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু দেশ-বিদেশের যে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা হাজার হাজার ডলার মূল্যের পেশাদার কাজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে দিলেন, তাঁদের নাম সামনে আনার ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের এত কার্পণ্য কেন?
এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—এটি কোনো রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি একটি গভীর কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সংকট। 'রিভার্স ব্রেইন ড্রেন' বা যাঁরা দেশে কিংবা প্রবাসে থেকে দেশের জন্য নিজের মেধা ও শ্রম বিলিয়ে দিতে চান, তাঁদের আমরা কীভাবে উৎসাহিত করব, যদি ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিটুকুও না মেলে? নাকি আমরা পরোক্ষভাবে ধরে নিচ্ছি যে দেশের উন্নয়নের জন্য আর কোনো দক্ষ মস্তিস্কের প্রয়োজন নেই? যিনি একটি প্রকল্পের প্রাথমিক ধারণা বা নকশা এঁকেছেন, তাঁর মেধা ও জ্ঞানকে মূল্যায়ন করতে এত দ্বিধা থাকা উচিত নয়। অন্তত জ্ঞান হস্তান্তরের (Knowledge Transfer) স্বার্থেও মূল স্থপতির সাথে একটি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের সেতু বজায় রাখা জরুরি।
কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। নীতিটা যেন এমন—"অমুক এটা আগে করেছিল, যেহেতু প্রচার হয়নি, তাই সেটা চেপে যাও বা ভিন্ন নামে নতুন করে ক্রেডিট নাও।" এভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেরা কাজগুলো স্থগিত হয়ে যায়, প্রকল্প প্রস্তাবে বদলে যায় নাম ও রূপরেখা। আর্কিটেক্টের মূল দর্শন, টেকনিক্যাল পাথওয়ে এবং রোডম্যাপ সঠিকভাবে হস্তান্তর না করে কাজ চালিয়ে গেলে দুটি ধারণার জন্ম হয়—হয় আপনি সবকিছু একাই বুঝে ফেলেছেন, অথবা আপনি আসলে কিছুই বুঝতে চান না, আপনার কেবল সস্তা কৃতিত্ব (Credit) নেওয়া দরকার।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম সেরা একটি কাজ ছিল 'নাগরিক সেবা' প্রজেক্ট—যদি কেউ এর গভীরতা বুঝে থাকেন। ন্যাশনাল ইন্টারঅপারেবিলিটির মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সেবাকে একটি এপিআই (API) ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল সার্ভিস এক্সচেঞ্জের আওতায় আনার রূপরেখা ছিল এটি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, 'নাগরিক সেবা' প্রজেক্টটি বর্তমানে স্থগিত। ইন্টার-অপারেবিলিটির ডিপিপিতে (DPP) এমন সব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞতাহীন লোকজনের ইনপুটের কারণে ঘটছে। আর্কিটেকচারাল ফিলোসফি, টেকনিক্যাল পাথওয়ে এবং রোডম্যাপ সম্পর্কে ধারণা না রেখে কাজ করলে, এর প্রকৃত সুফল থেকে রাষ্ট্র ও জনগণ বঞ্চিত হবে।
এটি কোনো অভিযোগ নয়, বরং একটি বিনীত অনুরোধ। মেধা, আইডিয়া, উদ্যোগ এবং শিল্পের সৃজনশীলতাকে সম্মান জানাতে শিখুন। একটি প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যায়, যখন যিনি প্রথম রেখাটি টেনেছিলেন, তাঁর নামটিও ইতিহাসে সগৌরবে টিকে থাকে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ফলকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভাইয়ের নামের পাশাপাশি সেই নেপথ্যের মূল কনসেপচুয়াল আর্কিটেক্টের নামটিও অনায়াসে রাখা যেত। হার্ড কিংবা সফট—যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজে মূল আর্কিটেক্টকে সম্মান করুন। অন্যথায়, আগামী প্রজন্মের কারিগর, স্থপতি এবং উদ্ভাবকেরা প্রশ্ন তুলবে—রাতের পর রাত জেগে দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মূল্য কী? ফলাফলের ভাগীদার হওয়াটা বড় কথা নয়, কিন্তু মেধার স্বীকৃতি দিয়ে আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণাকে সঞ্চারিত করাটাই রাষ্ট্রের আসল দায়িত্ব।
লেখকঃ প্রযুক্তিবিদ ও লেখক এবং সাবেক অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী





