যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারের মুকুট ফিরে পেল চীন
২০১৭ সালের পর এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারের শীর্ষস্থানটি নিজেদের দখলে নিয়েছে চীন। দেশটির ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটার সেন্টারে স্থাপিত ‘লাইনশাইন’ নামের একটি নতুন সুপারকম্পিউটার ২.১৯৮ এক্সাফ্লপ্স কর্মক্ষমতা প্রদর্শন করে এই গৌরব অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে এটি আমেরিকার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে থাকা পূর্ববর্তী শীর্ষ সুপারকম্পিউটার ‘এল ক্যাপিটান’-কে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
সুপারকম্পিউটারের বৈশ্বিক র্যাংকিং পরিচালনাকারী সংস্থা ‘টপ৫০০ ডট অর্গ’-এর তথ্য অনুযায়ী, লাইনশাইন বিশ্বের প্রথম সুপারকম্পিউটার যা গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ ছাড়াই কেবল মাত্র সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউ ব্যবহার করে ২ এক্সাফ্লপ্স-এর বেশি গতি তুলতে সক্ষম হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যেভাবে তৈরি হলো ‘লাইনশাইন’
আমেরিকার নানাবিধ প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চীন এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তাদের নিজস্ব অনন্য স্থাপত্য বা আর্কিটেকচারের কারণে। বর্তমানের বেশিরভাগ শীর্ষ সুপারকম্পিউটার যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জটিল গণনার জন্য এনভিডিয়া বা এএমডির জিপিইউ-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, সেখানে লাইনশাইন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছে।
প্রসেসর ও কোর: এই সুপারকম্পিউটারটি চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি কাস্টম ৩০৪-কোর প্রসেসরের ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা হয়েছে। এতে সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৯০ হাজার (১৩.৭৯ মিলিয়ন) কোর রয়েছে, যা ১.৫৫ গিগাহার্টজ গতিতে চলে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও দক্ষতা: বিশাল এই সিস্টেমটি চালাতে প্রায় ৪২.২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। তবে এটি প্রতি ওয়াট বিদ্যুতে ৫২.০৭ গিগাফ্লপ্স কাজ করতে পারে, যা অত্যন্ত বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ও দক্ষ।
টপ৫০০-এর অন্যতম আয়োজক ডক্টর জ্যাক ডোঙ্গারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে বলেন, “এটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক একটি সিস্টেম। জিপিইউ-এর ওপর নির্ভর না করে কেবল নিজস্ব সিপিইউ সিস্টেম তৈরি করেই তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে।”
এক্সাস্কেল ক্লাবে বৈচিত্র্য
চীন শীর্ষস্থান দখল করলেও বর্তমান বিশ্বে এখন মোট ৫টি সুপারকম্পিউটার ‘এক্সাস্কেল’ (১ এক্সাফ্লপ্স বা তার বেশি গতি) সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে। এর মধ্যে ৩টি আমেরিকায়, ১টি চীনে এবং ১টি জার্মানিতে অবস্থিত।
নতুন র্যাংকিং অনুযায়ী:
১. লাইনশাইন (চীন) — ২.১৯৮ এক্সাফ্লপ্স
২. এল ক্যাপিটান (আমেরিকা) — ১.৮০৯ এক্সাফ্লপ্স
৩. ফ্রন্টিয়ার (আমেরিকা) — ১.৩৫৩ এক্সাফ্লপ্স
৪. অরোরা (আমেরিকা) — ১.০১২ এক্সাফ্লপ্স
৫. জুপিটার বুস্টার (জার্মানি) — ১.০০০ এক্সাফ্লপ্স
টপ৫০০ সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, সুপারকম্পিউটারের দুনিয়ায় এখন কোনো একক প্রযুক্তির একচেটিয়া আধিপত্য নেই। ইন্টেল, এএমডি, এনভিডিয়া কিংবা কাস্টম অ্যাক্সিলারেটরের মতো বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো তাদের সুপারকম্পিউটার তৈরি করছে।
সরকারি তহবিল ছাড়া নিজস্ব উদ্ভাবন
আমেরিকার সাথে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে চীন সাধারণত তাদের সুপারকম্পিউটারের নকশা গোপন রাখে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘লাইনশাইন’ সুপারকম্পিউটারটি কোনো সরকারি অনুদান বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ছাড়াই সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে। আর সে কারণেই এর নির্মাতারা কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই এটি টপ৫০০-এর আন্তর্জাতিক পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত করতে পেরেছেন। তবে এই প্রসেসর বা চিপগুলো কোন কোম্পানি তৈরি করেছে কিংবা এতে কোন ধরনের সিলিকন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা কৌশলগত কারণে গোপন রাখা হয়েছে।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: এনগ্যাজেট





