আঞ্চলিক আস্থার পুনর্গঠনে আন্তঃসীমানা পানি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

পানি জাদুঘরগুলোর ডিজিটাল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

পানি জাদুঘরগুলোর ডিজিটাল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত
২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০০:১৯  

'গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অফ ওয়াটার মিউজিয়ামস'-এর সমন্বয়ে পানি জাদুঘরগুলোর ডিজিটাল প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী ‘১১তম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন। এতে মরক্কোর 'ওয়েসিস ইকোমিউজিয়াম' এবং বাংলাদেশ ও এশিয়ার প্রথম জাদুঘর  প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া 'হ্যাপি হোম'-এর কন্যা-শিশুদের পরিবেশিত পানি বিষয়ক বিশেষ নাটকসহ বিভিন্ন শৈল্পিক উপস্থাপনার মাধ্যমে নদী, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনবোধের নিবিড় সম্পর্কটি তুলে ধরা হয়।

ভার্চুয়াল এই সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল - ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্চিন্তা’। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশ নেন বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের ৫ শতাধিক নদী বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, পানি অধিকার কর্মী এবং জলবায়ু সুরক্ষা কর্মী।

একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত এই সম্মেলনের সমাপনী দিনে ২২ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমানা পানি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান ‘আস্থার সংকট’ (Trust Deficit) নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং এই অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান ও নদী অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।

সমাপনী অধিবেশনে বক্তারা বলেন, জলবায়ুর অস্থিরতা ও মানুষের অসহায়ত্ব মোকাবিলায় প্রচলিত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ‘পানি কূটনীতি’ ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন নদী ও পরিবেশের প্রবাহ এবং আন্তঃসীমানা জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ‘পানি-সামাজিক’ (Hydro-social) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের তাগিদ দেন তাঁরা।

‘আন্তঃসীমানা পানি জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। প্রচলিত কূটনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি হাইড্রোলজিস্ট, সমাজবিজ্ঞানী ও তরুণদের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারি যারা পানিকে সীমানার ঊর্ধ্বে দেখবে, তবেই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকৃত সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।”

একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন পানির স্বাভাবিক আচরণের নিশ্চয়তা কেড়ে নিয়েছে, যা আমাদের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তিনি বলেন, “আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই পানির ধরন বদলে যাচ্ছে। আমরা কীভাবে চাষাবাদ করব বা বাঁচব, তা এখন অনিশ্চিত। জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি মূলত একটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।” তিনি ‘সীমানা থেকে সংযোগ’ (From borders to bridges) গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জয়ন্ত বসু ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে সংবেদনশীল নদী অববাহিকায় বিশ্বাস পুনর্গঠনে তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “তথ্যই স্বচ্ছতা ও সুস্থিরতা আনে। ৫০ বছরের পুরোনো রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে বর্তমান জলবায়ু বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে হালনাগাদ বা স্বল্পমেয়াদি তথ্যের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।”

বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ সংকীর্ণ পানি-বণ্টন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারকে ভুলে যাই—আর সেটি হলো স্বয়ং নদী।” তিস্তা ও গঙ্গা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল কোটি মানুষের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিতে অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বৈশ্বিক আইনি প্রেক্ষাপট থেকে জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশন সেক্রেটারিয়েটের সদস্য রেমি কিন্না বলেন, বাংলাদেশের এই কনভেনশনে যোগদান স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি ‘শক্তিশালী বার্তা’। এটি দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে শিক্ষা গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সহায়তা করবে।

মেকং রিভার কমিশনের উদাহরণ টেনে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের লিড স্পেশালিস্ট ড. জন ডোর বলেন, সরকার, গবেষক, সুশীল সমাজ ও যুবসমাজের সমন্বিত উদ্যোগ (Multi-track engagement) অত্যন্ত জরুরি।

ঋতুভিত্তিক তথ্য আদান-প্রদান প্রটোকল তৈরি, একটি আঞ্চলিক ‘ওয়াটার স্কুল’ প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পানি শাসনের কেন্দ্রে রাখার আহ্বানের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।

অনুষ্ঠানে ভারতের উইমেন্স ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ওয়াটার রিসোর্সেস কাউন্সিলের ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ডা. মানসী বাল ভার্গব, পাকিস্তানের আখতার হামিদ খান রিসোর্স সেন্টারের পরিচালক ফাইয়াজ বাকির এবং চীনের সাংহাই নরমাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. ঝাং জিন অংশগ্রহণ করেন। এ সময় দেশ-বিদেশের শতাধিক নদী বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, পানি অধিকার কর্মী এবং জলবায়ু সুরক্ষা কর্মীরাও আলোচনায় অংশ নেন।

ডিবিটেক/এসআর/জেডএইচ