এআই নীতিতে 'মানুষের সুরক্ষা'য় গুরুত্বারোপ

এআই নীতিতে 'মানুষের সুরক্ষা'য় গুরুত্বারোপ
২৩ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:৫২  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  (এআই) নির্ভর অপতথ্য রোধে এআই নীতিতে মানুষের সুরক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একইসঙ্গে প্রযুক্তিতে মানবাধিকার রক্ষাকে ‘অসম্ভব’ ভাবা হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে তা সম্ভব। আর মানুষের আস্থা অর্জন ছাড়া এআই ও প্রযুক্তির এই যুগে যেভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে, তা রোধ সম্ভব নয় বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 

২৩ নভেম্বর, রবিবার  বিভিন্ন দেশের চিন্তাবিদ, রাজনীতিক, কূটনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের নিয়ে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন বক্তারা। 

নলেজ ফর ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক প্রো চুং এর সঞ্চালনায় ‘কৃত্রিম বিশ্বাস: এআই যুগে বাঁচা, ভালোবাসা ও মিথ্যা’ শীর্ষক অধিবেশনে উঠে আসে অ্যালগরিদম কীভাবে আমাদের বন্ধুদের চেয়ে আমাদের উদ্বেগ সম্পর্কে বেশি সচেতন। প্রযুক্তি যখন কারসাজিকে উৎসাহিত করে, তখন এটি সংযুক্তও করে। যখন বিশ্বাস নিজেই একটি জাল হয়ে যায়, তখন সত্য, গণতন্ত্র এবং ঘনিষ্ঠতার কী হাল হয়! এসময় ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক, ডেটা আসক্তি থেকে ডিজিটাল প্রেম, নজরদারি পুঁজিবাদ থেকে বিশ্বাসের বাণিজ্য পর্যন্ত, আমাদের অস্তিত্বের অস্থির সৌন্দর্য অন্বেষণ করেন বক্তারা।

এমন বাস্তবতাকে সামনে এনে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান 'বিশ্বাসে চিড় ধরা পরিস্থতিতে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে' মন্তব্য করে সিটি ব্যাংকের সহযোগী রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট বললেন,  এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা শনাক্তকরণ সুবিধা। লেনদেনের সব রেকর্ড থাকে। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন শনাক্তে এআই অনেক সহায়ক হতে পারে।

একই ধরণের আশার পায়রা উড়িয়ে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ইনিশিয়েটিভের মং মিন টু অং বললেন, প্রযুক্তিতে মানবাধিকার রক্ষাকে ‘অসম্ভব’ ভাবা হয়। যেন উদ্ভাবন আর অধিকার একসঙ্গে চলতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে এটা সম্ভব। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতা।

গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ইনিশিয়েটিভ বিভিন্ন দেশের সরকারকে এআই নীতির ক্ষেত্রে নানা ধরনের পরামর্শ দেয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এসব নীতিতে মানুষের আস্থা অর্জন জরুরি। মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে আইন ও নীতি করা এবং তা বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি অধিকার লঙ্ঘন হলে প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা। কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই নীতি থাকা প্রয়োজন।

এই নীতি প্রসঙ্গে নেপালের অ্যাকাউন্টিবিলিটি ল্যাবের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান নারায়ণ অধিকারী বলেন, মানুষ তখনই আস্থা রাখবে, যখন সে নিশ্চিত হবে যে নীতিটি তার বিরুদ্ধে কাজ করবে না। গণতন্ত্র, নাগরিক অংশগ্রহণ, সমতা- সবকিছুই মানুষের এই আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু এখন প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে এই বিশ্বাসকে নানাভাবে প্রভাবিত বা বিকৃত করা হচ্ছে। প্রযুক্তির বড় অংশই এমন দেশ থেকে আসে, যাদের প্রেক্ষাপট, ভাষা, মূল্যবোধ বা সামাজিক কাঠামো এ অঞ্চলের মতো নয়। ফলে এই প্রযুক্তি যখন এ সমাজে প্রয়োগ করা হয়, তখন পক্ষপাত, ভুল ব্যাখ্যা, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য তৈরি হয়, যা মানুষের প্রকৃত বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এর আগে 'দৈত্যের সাথে নৃত্য: ক্ষুদ্র-রাষ্ট্র বেঁচে থাকার শিল্প' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা জানালেন, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলি এমন একটি অঞ্চলে বসবাসের জন্য অভিযোজিত হয়েছে যেখানে দৈত্যরা শাসন করে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি কেন্দ্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাদের প্রত্যেকেই শীতল যুদ্ধের দাবার ছক থেকে শুরু করে বর্তমান ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংঘাত পর্যন্ত আনুগত্য দাবি করে এবং সুযোগ প্রদান করে। এই গোলটেবিল বৈঠকে দেখা গেছে যে কীভাবে এই দেশগুলি জনাকীর্ণ কৌশলগত পরিবেশে তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখে কূটনীতি, বিলম্ব এবং দক্ষ আলোচনা ব্যবহার করে সতর্কতা এবং উদ্ভাবনীতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করে। যখন প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া থাকে, তখন বেঁচে থাকা নিজেই একটি শিল্পরূপে পরিণত হয় যা সৃজনশীলতা, দৃঢ়তা এবং প্রবৃত্তির সঙ্গে কোলাকুলি করে।

জার্মানি'র আরটিএল নর্ড মডারেটর ডেভিড প্যাট্রিশিয়ানের সঞ্চালনায় এই অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রফেসরিয়াল ফেলো, সেলিম জাহান, মালয়েশিয়ার প্ল্যান্টেশন অ্যান্ড কমোডিটিজের প্রাক্তন মন্ত্রী জুরাইদা বিন্তি কামারুদ্দিন, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদ শাহাব আহমেদ, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর পলিসি ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তৌসিফ মেহরাজ রায়না, সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, পারভেজ করিম আব্বাসি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনির, নেপালের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্ট গবেষণা পরিচালক প্রমোদ জয়সওয়াল এবং ভারতের সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জেভিয়ার। 

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে কোলাহলের সময়ে সাহস, যাচাইকরণ এবং গল্প বলার বিষয়ে সম্পাদক, প্রতিবেদক এবং চিন্তাবিদদের মধ্যে জম্পেস আড্ডা জমেছিলো 'নির্বাসনে সত্য: সাংবাদিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার লড়াই' বিষয়ক সেমিনারে। সেমিনারে যখন সত্য নিজেই ঐচ্ছিক মনে হয় তখন মিডিয়া কীভাবে আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে- সেই প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। বক্তারা বলেন, যখন প্রযুক্তি যেকোনো বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, তখন সাংবাদিক সাক্ষী এবং সন্দেহভাজন উভয়ই হয়ে ওঠেন। পাকিস্তানের গণমাধ্যম মিনিট মিরর এর কূটনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক জয়েন খান এর সঞ্চালনায় এই আলাপনে অংশ নেন জার্মানির মার্কেটর ফাউন্ডেশনের ফেলো ফর ইইউ সাউথ এশিয়া রিলেশনস লিও উইগার, ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ) আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা ক্যারোলিনা চিময় এবং দ্য ডেইলি স্টার এর স্পেশাল কন্টেন্ট এডিটর শামসুদ্দোজা সাজেন।

বেলজিয়ামের ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি প্রকল্প পরিচালক আনাস্তাসিয়া এস উইবাওয়ার সঞ্চালনায় ‘কীভাবে ভুয়া তথ্য শাসনব্যবস্থার হাতিয়ার হয়ে উঠল’ শীর্ষক আলোচনায় উঠে আসে বিশ্বজুড়ে সত্য এখন ঐচ্ছিক হয়ে উঠছে। সরকার, রাজনীতিক, কর্পোরেশন এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কগুলি অ্যালগরিদমিকভাবে, আবেগকে প্ররোচিত করে বাস্তবতার একটি নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করছে এবং ত যাচাই করা কঠিন। দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে,  রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত মিথ্যা, কৃত্রিম মিডিয়া এবং সমন্বিত প্রভাব প্রচারণার প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছেন ফ্যাক্ট-চেকাররা। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ৮৩৭টি অনন্য মিথ্যা দাবি শনাক্ত করেছে তারা। 

এমন পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রকে ও তথ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন ইউএনডিপির লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর ডিজিটাল ডেমোক্রেসি অ্যানালিস্ট আলভারো বেলত্রানো উরুতিয়া। আলাচনায় তিনি বলেন, অনেকেই এসব খাতে বিনিয়োগ করছেন, নানা সমাধান তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছেন, কিন্তু সমস্যার মূলটা জানছেন না। 

নির্বাচনের সময় ভুল তথ্যের বিষয়টি শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়, পুরো প্রক্রিয়াই ঝুঁকিতে থাকে উল্লেখ করে ইউএনডিপি বাংলাদেশের ইলেকটোরাল সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রধান প্রযুক্তি পরামর্শক অ্যান্দ্রেস দেল কাস্তিও বলেন, নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। এতে জন-আস্থা গড়ে ওঠে। নির্বাচন পরিচালনায় স্বচ্ছতা না থাকলে ভুল তথ্য সহজে ছড়িয়ে যায়।

তথ্যব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ না করলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে এবং কার্যকারিতা হারায় বলে মন্তব্য করেন সিঙ্গাপুরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়নুল আবেদিন রশিদ। তিনি বলেন, তরুণদের কাছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য-পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ বা সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপরই নির্ভর করবে—তথ্য খাত কোন দিকে যাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসঙ্গে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ইনিশিয়েটিভের জবাবদিহি ও উদ্ভাবন ম্যানেজার মং মিন টু অং বলেন, বিশ্বে এআই নীতির তিনটি মডেল রয়েছে—উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি যেখানে বিধিনিষেধ কম; নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ইউরোপীয় নীতি এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা চীনের নীতি। এই তিন ধরনের কাঠামোর মধ্যে কোথাও কঠোর আইন, কোথাও নমনীয় নীতিমালা আছে।

এআই নীতিতে মানুষের সুরক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মং মিন টু অং। তিনি বলেন, এখানে দেখতে হবে ব্যক্তিগত তথ্যের কীভাবে কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, এআইয়ের বৈষম্যমূলক ব্যবহার রোধ এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা। এসবকে প্রাধান্য না দিলে আস্থা তৈরি হবে না।

কোনো রাষ্ট্রই পুরোপুরি আইন ছাড়া ভুল তথ্য প্রতিরোধ করতে পারে না উল্লেখ করে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের আইন উল্টো তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তাই আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইন প্রণয়নের সময় জনগণ ও রাজনৈতিক অংশীদারদের সতর্ক থাকা জরুরি। তারা যেন বুঝতে পারে আইনটি সত্যিই তথ্য রক্ষা করছে, নাকি তথ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়াও গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট-চেকার থাকা নিয়ে এই সম্পাদক বলেন, একটি গণমাধ্যমের কেন ফ্যাক্ট-চেকার দরকার হবে? কারণ, প্রত্যেক প্রতিবেদক নিজেই একজন ফ্যাক্ট-চেকার। পেশাদার সাংবাদিকতায় এটার দরকার নেই।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন ৮৫টি দেশের ২০০ জন আলোচক, ৩০০ জন ডেলিগেট এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী। অতিথিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, সামরিক বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
ডিবিটেক/পিএসিজি/মুইম