ওয়াশ খাতে বরাদ্দ কমেছে ৪০ শতাংশ
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে সরকারি বরাদ্দ কমে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস। বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত প্রাক-বাজেট সংবাদ সম্মেলনে এ উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পলিসি ব্রিফ তুলে ধরেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। পলিসি ব্রিফটি ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং সিনিয়র ফেলো মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস- এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে প্রণয়ন করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত তিন বছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপর্যুপরি বন্যার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ল্যাট্রিনগুলো উপচে পড়ে পানির উৎস দূষিত হচ্ছে । অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে হাজার হাজার সাবমারসিবল পাম্পের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত সেচকাজ এবং ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের উদ্যোগ না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে ।
পলিসি ব্রিফ তুলে ধরে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এই বরাদ্দ কমে যাওয়ায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৬ অর্জন ও জলবায়ু সহনশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১৮৭.২৮ বিলিয়ন (১৮,৭২৮ কোটি) টাকায় পৌঁছেছিল । তবে এরপর থেকেই এই খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে তীব্র ও ধারাবাহিক পতন শুরু হয় । ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ১৪৯.৮১ বিলিয়ন টাকায়। তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ১১৬.১৭ বিলিয়ন টাকা হয় এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর চক্রে তা সর্বনিম্ন ১০৯.০১ বিলিয়ন টাকায় গিয়ে ঠেকেছে । অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে এই খাতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের সাথে জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থার মতো মৌলিক খাতে বরাদ্দ সংকোচনের এক চরম বৈপরীত্যকে প্রকাশ করে ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও নিরাপদ সুপেয় পানি পাচ্ছে মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ। শহরে নিরাপদ পানির সুবিধা ৭১ শতাংশ হলেও গ্রামে তা ৪৮ শতাংশ।
ওয়াশ খাতে শহরকেন্দ্রিক বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়। মোট উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ শহর ও ওয়াসাগুলো পেলেও চর, হাওর, উপকূল ও পাহাড়ি এলাকার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো পেয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ২২ শতাংশ বরাদ্দ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা একাই দেশের মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় ২৯ শতাংশ পেয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি বড় শহর চলতি অর্থবছরে কোনো বরাদ্দই পায়নি।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশ-এর পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, গ্রামীণ এলাকায় আর্সেনিক ও ব্যাকটেরিয়া দূষণের কারণে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তিনি জানান, প্রাথমিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও প্রকৃত অর্থে ‘নিরাপদ ব্যবস্থাপনার’ আওতাধীন সুপেয় পানি—যা বাড়ির আঙিনায় প্রাপ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়া যায়। এছাড়া রাসায়নিক ও অণুজীব দূষণমুক্ত পানি পাচ্ছে দেশজুড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ । গ্রামীণ এলাকার টিউবওয়েলে আর্সেনিক ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ এবং কাঠামোগত অর্থায়নের বৈষম্যের কারণে শহরের সুপেয় পানির সুবিধা (৭১ শতাংশ) ও গ্রামের সুবিধার (৪৮ শতাংশ), এতে করে দেখা গেছে শহর এবং গ্রামের মধ্যে ২৩ শতাংশের এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে ।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, গ্রামীণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দরিদ্র পরিবারকে ওয়াশ ভাতা চালু এবং স্কুলে জেন্ডার-বান্ধব টয়লেট স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
এসময় মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান (ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনে), ইশরাত শবনম (এফএসএম নেটওয়ার্ক), মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (বিডব্লিউডব্লিউএ), রেবেকা সান ইয়াত (সিইউপি), মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (বাউইন), যোসেফ হালদার (ফানসা), এবং মোঃ ফজলুল হক (ইডব্লিউপি) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ডিবিটেক/এফআই/ইকে



