ভার্চুয়াল সম্প্রচারে শেখ হাসিনার রায় পাঠ
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় পাঠ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দার পাশাপাশি মুঠোফোনে নিজ নিজ অবস্থান থেকেই তা অবলোকন করছেন নাগরিকরা। বেসরকারি টেলিভিশনগুলো ব্যবহার করছে বিটিভির লাইভ ফিড। তবে টিভির চেয়ে অনলাইনে ফেসবুক ও ইউটিউবে রায় জানতে ভিড় রয়েছে বেশি।
১৭ নভেম্বর, সোমবার বেলা দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথম অংশ পড়া শুরু করেন বিচারিক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।এ মামলায় পলাতক রয়েছেন শেখ হাসিনা ও কামাল।
তবে গ্রেফতার হয়ে প্রায় বছরখানেক ধরে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি মামুন। যদিও রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। ফলে সাবেক এই আইজিপির শাস্তির বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দেন প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা চাওয়া হয়।
আদালত টেলিফোনিক আলাপে ড্রোন ও মারণাস্ত্র ব্যবহারে শেখ হাসিনার আদেশের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। তুলে ধরা হচ্ছে বেশ কয়েকটি ভিডিও প্রমাণ।
এদিন সকাল ৯টা ১০ মিনিটের পর কড়া নিরাপত্তায় কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে মামুনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। শেষবারের মতো অনেকটা মাথা নিচু করেই ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় ঢোকেন তিনি।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।
আদালতে পলাতক দুই আসামির পক্ষে রয়েছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনি বলেছেন, আমি তো সবসময় আশা করি আমার মক্কেল (শেখ হাসিনা) খালাস পাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার ভালোভাবে হয়েছে, স্বচ্ছ হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনা খালাস পেলে আমি সবচেয়ে খুশি হতাম। আমি আমার মক্কেলের খালাস চাই। এই চাওয়াটা তো স্বাভাবিক। এটা প্রত্যেকেই চাইবে।
শেখ হাসিনার এ মামলায় মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য-জেরা শেষ হয়। আর ৯ কার্যদিনে চলে প্রসিকিউশন-স্টেট ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক পাল্টা যুক্তিখণ্ডন। ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রের প্রধান আইনকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সমাপনী বক্তব্য এবং চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেনের যুক্তিখণ্ডন শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারণে সময় দেওয়া হয়।
যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে প্রসিকিউশন। তবে রাজসাক্ষী হওয়ায় মামলার অন্যতম আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। যদিও তার খালাস চেয়েছেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ। হাসিনা-কামালও খালাস পাবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস রাষ্ট্রনিযুক্ত আমির হোসেনের।
এ মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ৮৪ জনকে। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টিএসসির পায়রা চত্বরের পূর্ব পাশে একটি এলইডি স্ক্রিন স্থাপন করে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারের প্রথম রায় সরাসরি সম্প্রচারের আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। সেই রায় সরাসরি লাইভ দেখতে টিএসসিতে ভিড় করেছেন অনেকে।
অপরদিকে দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে ‘খেলার মাঠে রূপান্তর’ করার দাবিতে বুলডোজার নিয়ে সেখানে জড়ো হয়েছেন জুলাই স্মৃতি পরিষদ ও জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা। ঢাকা কলেজ এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে সেখানে অপেক্ষায় থাকা জুলাই স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক নাহিদ হাসান বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ চাই। জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী, আহত যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যরা সবাই আজ একত্রিত হয়েছেন। আমাদের দাবি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বা তাদের দোসরদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এখান থেকেই ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নীলনকশা তৈরি করা হতো। তাই আমরা এই বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিতে চাই, এখানে হবে একটি উন্মুক্ত মাঠ।
ডিবিটেক/এনডি/ইক



