ফলোআপ: দ্রুতই সূচক সূচক ৫০ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
ইন্টারনেটের স্বাধীনতায় ৫ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
বিশ্বজুড়েই কমছে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা। তবে গত বছরের জুলাই অভ্যাত্থানের পর আংশিক স্বাধীনতার তালিকায় থেকে ৫ পয়েন্ট এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউজের প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফ্রিডম অন দ্য নেট-এর মূল্যায়ণ অনুসারে ৭২টি দেশের মধ্যে ২৮টি দেশেই অবস্থার অবনতি হয়েছে, যেখানে ১৭টি দেশে সামগ্রিকভাবে উন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। গত বছর ইন্টারনেটের স্বাধীনতা সূচকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৪০ পেলেও এবার স্কোর বেড়ে হয়েছে ৪৫।
মোট তিনটি বড় ক্যাটাগরিতে এই স্কোর দেয় ফ্রিডম হাউজ ডট অর্গ। এগুলো হলো ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকারে বাধা , কন্টেন্ট সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন। এই তালিকায় ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকারে বাধায় ২৫ নম্বরের মধ্যে ১২; কন্টেন্ট সীমাবদ্ধতায় ৩৫ নম্বরের মধ্যে ২০ এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন সূচকে ৪০ এর মধ্যে ১৩ পেয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনের স্কোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অযৌক্তিক শাটডাউন কমেছে, বিটিআরসির নীতিমালা আরও স্বচ্ছ হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের অভাব এখনো চ্যালেঞ্জ পর্যায়ে রয়েছে। কন্টেন্ট সীমাবদ্ধতায় কিছু ওয়েবসাইট ব্লকিং থাকলেও স্বচ্ছতা বেড়েছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সেলফ-সেন্সরশিপ কমেছে। প্রোপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য নিয়ে উদ্বগ বহাল রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত এই উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে। অবশ্য এখনও আংশিক স্বাধীন তালিকাতে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (৪৮), ভারত (৫১) ও শ্রীলঙ্কা (৫৩)। তবে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট স্বাধীনতা কমে গেলেও বাংলাদেশে এই উন্নতিকে রিপোর্টে “গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুনে ছাত্র-জনতানেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পালাবদল বাংলাদেশের ডিজিটাল অধিকার পরিবেশে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আগস্টে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ, শাটডাউন ও নজরদারির নীতিতে পরিবর্তন আসে। তার নেতৃত্বে বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ-উল-বারি'র 'ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং অযৌক্তিক ইন্টারনেট শাটডাউন আর সহ্য করা হবে না' অ্যাক্সেস বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের মে মাসে বিতর্কিত সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (সিএসএ) বাতিল করে সরকার সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ (সিএসও) জারি করায় সীমিত আকারে স্বস্তি আসার কথাও রয়েছে প্রতিবেদনে।
ফ্রিডম হাউসের ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৫’ প্রতিবেদনে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। গত বছরের ৪০ থেকে এ বছর দেশের স্কোর বেড়ে ৪৫-এ পৌঁছেছে- যা শুধু সাত বছরের সর্বোচ্চই নয়, বরং অঞ্চলগতভাবে ভারত(৫১) ও শ্রীলঙ্কার(৫৩) কাছাকাছি অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
ফ্রিডম হাউজের বিশ্লেষণ বলছে, বৈশ্বিক অনলাইন স্বাধীনতা কমলেও এ বছর ৫ পয়েন্ট এগিয়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচকে ভারতের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুনে কর নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ প্রায় সাত ঘন্টা ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে এবং শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতারের পর কেনিয়া সবচেয়ে তীব্র পতনের সম্মুখীন হয়। অপরদিকে সে বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বেশ কয়েকদিন বন্ধ রাখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ছাত্র-জনতার তীব্র বিদ্রোহের মুখে এই দমনমূলক নেতৃত্বের উৎখাত হয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এই সরকার কিছু ইতিবাচক সংস্কার কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়। তারা দমনমূলক প্রথার অবসান ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কঠোর ও দমনমূলক সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করেছে এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করেছে। যদিও কনটেন্ট অপসারণ, অনলাইন বক্তব্যের জন্য ফৌজদারি শাস্তি এবং নজরদারি সংক্রান্ত উদ্বেগজনক কিছু বিধান রয়ে গেছে।
ফ্রিডম হাউসের মূল্যায়নে নতুন অধ্যাদেশে অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে কিছু শক্তিশালী ব্যবস্থা যোগ হয়েছে এবং আপিল ও অভিযোগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয়েছে, তবে বিস্তৃত পরিসরে “সাইবার সন্ত্রাসবাদ” ধারা, গোপন নজরদারির সুযোগ এবং সেন্সরশিপের ক্ষমতা এখনও ঝুঁকি ও অপব্যবহার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবদনে বাংলাদেশ ইন্টারনেট স্বাধীনতার ইতিবাচক বিষয়ে বলা হয়েছে- সরকার ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক উন্মুক্ততা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাইবার আক্রমণ ও ডেটা লিকের বড় ঘটনা রিপোর্ট হয়নি। মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ কিছুটা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে। পরক্ষণেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে সিএসও-র অস্পষ্টতায় অপব্যবহার হওয়ার বিষয় ছাড়াও ডিজিটাল নজরদারি ও গোপন রেকর্ড সংগ্রহ এখনও উদ্বেগের শীর্ষে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নীতিগত সংস্কার ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিবেশে একটি নতুন ইতিবাচক ধারা তৈরি করেছে। তবে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখালেও, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আইনগত অস্পষ্টতা, নজরদারি, সেন্সরশিপ ঝুঁকি, ডিজিটাল বিভাজন অবশিষ্ট রয়ে গেছে। সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গঠনে এখনও বাংলাদেশকে অনেক দূর যেতে হবে।
ডিজিবাংলাটেক.নিউজ-এ এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীম উদ্দিন স্বাক্ষরিত বার্তায় জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন টেলিকম অধ্যাদেশ, সার্ভেইল্যান্স কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ পাস করাসহ ইন্টারনেটের স্বাধীনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের ফলশ্রুতিতে সূচকের এই উত্থান। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ বিশ্বমানের হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতি দেশটির ডিজিটাল ভবিষ্যৎ আরও উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত করার প্রত্যয়কেই প্রতিফলিত করে। আশা করা যাচ্ছে, মানসম্পন্ন ইন্টারনেট গভর্নেন্স, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, টেলিকমের কমপ্লেক্স লাইসেন্স রেজিম সহজ করা, নাগরিক সেবা এবং ইন্টার অপারেবিলিটিতে যে উদ্যোগগুলো নেয়া হচ্ছে তাতে খুব দ্রুতই বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার সূচক ৫০ ছাড়িয়ে যাবে।
ডিবিটেক/আইএইচ/ওআর



