ভিডিও গেইমে স্নায়ুর ক্ষতি সনাক্তের মিশনে বাংলাদেশী গবেষক ইশতিয়াক
ডায়াবেটিসে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হাত-পা অবশ হওয়া, ঝিনঝিন করা বা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় রোগীরা দেরিতে তা টের পান। ভিডিও গেইম খেলার মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত শনাক্তকরণের একটি পরিধেয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন জার্মানির চার সদস্যের গবেষক দল। ম্যাগডেবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের এই গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশী ডেটা বিজ্ঞানী ইশতিয়াক সিদ্দিকী। গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক পিটার মের্টেন্স এর নেতৃত্বে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন জার্মানিতে পাড়ি জমানো এই ডেটা বিজ্ঞানি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে পোস্ট গ্রাজ্যুয়েট করতে গিয়ে এই গবেষণার প্রায়োগিক কাজের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর।
ইশতিয়াক গত ৫ বছর ধরে পরিধেয় এই স্বাস্থ্য প্রযুক্তির দেখভাল করেছেন। আর তার কাছে গষেণার মূল রসদ অর্থাৎ গেইমটি তুলে দিয়েছিলেন চীনা গবেষক আন টাও মিন। সেটা নিয়েই আরো তিন অনুজকে নিয়ে প্রায়েগিক দিকটা সামাল দিচ্ছেন ইশতিয়াক।
গবেষণাটি এরই মধ্যে বিভিন্ন চিকিৎসা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে এই উদ্ভাবনকে ‘ডায়াবেটিসে স্নায়ু ও মস্তিষ্কের ক্ষতি আগেভাগে ধরতে ম্যাগডেবার্গে নতুন স্মার্ট টেস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জানাগেছে, নতুন এই পরিধেয় প্রযুক্তিতে একটি মোবাইল গেইম তৈরি করেছেন গবেষকরা। গেইমটি খেলার সময় গেইমারকে সেন্সরযুক্ত বিশেষ ইনসোল যুক্ত স্যান্ডেল পড়তে হয়। ওই স্যান্ডেল থেকে প্রাপ্ত ডেটা যায় গেইম কনসোলে। এরপর গেমের তথ্য বিশ্লেষণ করে পায়ের কোন অংশ কতটা অনুভব করতে পারে তা মাপা যায় এবং রোগীর নিউরোপ্যাথি আছে কি না তা জানা যায়। ফলে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রোগীর ঝুঁকি ও মানসিক ক্ষমতার দুর্বলতাও নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব হয়।
জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্য এবং ইউরোপীয় উন্নয়ন তহবিলে পরিচালিত গবেষণায় রোগীদের বিশেষ সেন্সরযুক্ত ইনসোল (জুতার ভেতরের সোল) ব্যবহার করা হয়। ওই জুতা পরেই তারা স্মার্টফোনে ১২ মিনিট ধরে ছোট ছোট ৪টি গেম খেলতে হয়। মূলত জুতার মাধ্যমেই গেইমটি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
এরই মধ্যে পরিধেয় প্রযুক্তিটি ৩২৯ জন রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এসময় তাদের নড়াচড়ার তথ্য সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, খেলাভিত্তিক এই পদ্ধতি প্রচলিত মেডিকেল পরীক্ষার মতোই নির্ভুলভাবে স্নায়ু ও মানসিক সমস্যার পূর্বাভাস দিতে পারে। এর মাধ্যমেই ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ু ক্ষতি ও মানসিক ক্ষমতার দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব।
মূলত ডায়াবেটিসে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হাত-পা অবশ হওয়া, ঝিনঝিন করা বা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় রোগীরা দেরিতে তা টের পান। নতুন এই পদ্ধতি দ্রুত শনাক্তকরণে সহায়তা করবে বলে মনের করতে আশাবাদী গবেষকেরা। ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের স্নায়ুর ক্ষতি হয়, কিন্তু ডাক্তাররা প্রায়ই তা খুব দেরিতে শনাক্ত করেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতে আগেভাগে রোগীর চিকিৎসা শুরু করা যাবে।
এই স্বাস্থ্য প্রযুক্তিটিকে গাড়ির নিরাপত্তা পরীক্ষার মতো উল্লেখ করে গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক পিটার মের্টেন্স বলেন, “এটি একধরনের ‘নার্ভ টিউভি’। নিয়মিত পরীক্ষা হিসেবে চালু হলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বড় সুবিধা হবে।”
অপরদিকে ২০২১ সাল থেকে এই প্রকল্পে কর্মরত ইশতিয়াক সিদ্দিকী ডিজিবাংলাটেকডটনিউজ-কে বললেন, ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায়ই পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হয়। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে হাত-পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে রোগীরা বুঝতে পারেন না কখন জুতা পায়ে আঘাত করছে। ফলে ক্ষত হয় এবং সংক্রমণ বাড়ে। তাদের এই গবেষণাটি সেক্ষেত্রে আগাম রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দেবে। এই কাজ আরো নির্ভুল করতে সিস্টেমটিতে এরই মধ্যে মাইক্রো-সার্ভিস ভিত্তিক মডুলার আর্কিটেকচারে আপগ্রেড করা হয়েছে। গেইম কনসোলটি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রথমে বিশেষ জুতা ও গেম কনসোল তাদের নিজেদের ক্লিনিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। জার্মানির হানুভার, লুক্সেমবার্গ, হার্ভাস্টার্ট ও পাশের দেশ লুক্সেমবার্গের চারটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হবে। রোগীরা সেখানে গেম খেলবেন, আর ডেটা যাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সেখান থেকে ডেটা বিশ্লেষণ করে জানিয়ে দেয়া হবে গীদের সর্বশেষ অবস্থা ও ভবিষ্যতে করণীয় বিষয়ে।
ডিভাইসটি কীভাবে কাজ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইনসোলের মাঝে দুইটি সেন্সর রয়েছে। একটি প্রেসার সেন্সর। অপরটি টেমপারেচর সেন্সর। এই সেন্সরের ডেটা মনিটর করেই মূলতঃ ব্যবহারকারীর পায়ের ওপর কন্ট্রোল হারানোর পূর্বাভাস, স্নায়ুবিগ রোগ নির্ণয় কিংবা গ্যাংরিং এর মতো রোগ সনাক্ত করা যাবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ইশতিয়াক সিদ্দিকী বলেন, জার্মানির ডেটা প্রোটকশন অ্যাক্ট খুবই শক্ত। তাই এখান থেকে রোগীদের তথ্য পাচার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর আমি এই সিস্টেমের সার্ভার ব্যবস্থাপনা করি। এ কাজে আমার অধীনে আরো তিন জন রয়েছেন। ক্লিনিক্যাল সাপোর্টের জন্য রয়েছেন ২৫ সদস্যের একটি দল। ইতিমধ্যেই এই পদ্ধতিটি ব্যবহারে চায়না ও আমেরিকা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ আগ্রহ দেখায় তাহলে আমি অবশ্যই সহযোগিতা করবো।







