আইনকে ‘সরকার সুরক্ষা আইনে’ রূপান্তরের অভিযোগ; ৬৩ শতাংশ গ্রেপ্তার রাজনৈতিক কারণে
সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের চক্রান্ত: নাগরিক সংলাপ
- হ্যাকিং ও প্রতারণা মোকাবিলার বদলে ভিন্নমত দমন ও নাগরিকদের হয়রানির হাতিয়ার করার শঙ্কা।
- ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর হওয়া গ্রেপ্তারের ৬৩ শতাংশই রাজনৈতিক সমালোচনার জেরে: ড. নাবিলা ইদ্রিস।
- কাওরান বাজারে সাত মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ সংলাপে মানহানিকে সাইবার আইনের বাইরে রাখার দাবি।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পরিবর্তে মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে চরমভাবে সংকুচিত করবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার ছদ্মাবরণে এ আইনের নির্বিচার অপব্যবহার করে ভিন্নমত দমন এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র তৈরি করছে সরকার।
২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরান বাজারের বিডিবিএল ভবনে মানবাধিকারবিষয়ক সাতটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জাতীয় নাগরিক সংলাপে এসব মতামত ব্যক্ত করা হয়। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’, ‘দৃক’, ‘নাগরিক কোয়ালিশন’, ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস), ‘জাস্টিস অ্যান্ড রাইটস অ্যালায়েন্স’ (জেআরএ), ‘ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্ক’ এবং ‘বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্স’ যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
"সাইবার সুরক্ষা, না কণ্ঠরোধ? কার স্বার্থে মতপ্রকাশের নতুন সীমা নির্ধারণ ও আইন সংশোধন"—শীর্ষক এই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম এবং সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
মূল ধারণাপত্র উপস্থাপন করে ফাহিম মাশরুর বলেন, সাইবার আইনের মৌলিক কাজ হওয়ার কথা ছিল ফিশিং, হ্যাকিং কিংবা আর্থিক তছরুপ থেকে ব্যক্তি ও ব্যবসাকে সুরক্ষা দেওয়া। অথচ সরকার আগের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতোই এটিকে রাজনৈতিক বিরোধীদের ঘায়েল করার অস্ত্র বানাচ্ছে। তিনি নারী ও শিশুর ডিজিটাল সুরক্ষাসংক্রান্ত ধারাগুলো পৃথকভাবে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সাইবার সুরক্ষার নামে সরকার কার্যত "সরকার সুরক্ষা আইন" প্রণয়ন করতে চাইছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করায় নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সরকার তাদের নিজস্ব বয়ানের বাইরে কোনো সত্য শুনতে নারাজ।
প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকার বিপজ্জনকভাবে কর্তৃত্ববাদের সীমারেখা অতিক্রম করছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের যা করতে বহু বছর লেগেছিল, বর্তমান শাসকদল অত্যন্ত দ্রুত সেই পথে হেঁটে নাগরিকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস উদ্বেগের সঙ্গে জানান, গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে সাইবার আইনে হওয়া মোট গ্রেপ্তারের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনার কারণে। এসব আটকের আইনি দুর্বলতা ঢাকতেই সরকার সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তারের পরিধি বাড়ানোর ছক কষছে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ জোর দিয়ে বলেন, অনলাইন জুয়া ও আর্থিক প্রতারণা দমন জরুরি হলেও রাজনৈতিক মতামত বা নীতিগত সমালোচনাকে ফৌজদারি অপরাধ কিংবা মানহানির আওতায় আনা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। সরকারের সমালোচনাকে দ্রুত অপরাধ হিসেবে গণ্যকারী পুলিশ অনলাইনে নারীদের হেনস্তা ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয় থাকে বলে মন্তব্য করেন অ্যাক্টিভিস্ট ডা. তাজনূভা জাবীন।
সংলাপে আরও অংশ নেন ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া, এনসিপির সারোয়ার তুষার, নাগরিক কোয়ালিশনের হাসিব উদ্দিন হোসেন এবং এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজ ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে শহিদুল আলম বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি যেসব গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুতই তারা অবস্থান পরিবর্তন করেছে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং জনগণের—তাই জনস্বার্থবিরোধী হঠকারী আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান তিনি।
//ডিবিটেক/এফএমপিআর/এসএমই/এমভিএনও//





