• এআই বিস্তারে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও সাশ্রয়ী ৪জি স্মার্টফোন জরুরি
  • আগামী ১২ মাসে বাংলাদেশে এআইভিত্তিক শর্ট ড্রামা তৈরির পরিকল্পনা
  • ডেটাসেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও বাংলা ভয়েস প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আহ্বান

এআই বিস্তারে ৪জি, বাংলা কনটেন্ট ও ডেটাসেন্টারে জোর

কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা

এআই বিস্তারে ৪জি, বাংলা কনটেন্ট ও ডেটাসেন্টারে জোর
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৪০  

ডিজিটাল সংযোগের সুফল তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারে সাশ্রয়ী ৪জি স্মার্টফোন, বাংলা ভাষায় ভয়েস-ভিত্তিক কনটেন্ট এবং হাই-পাওয়ার ডেটাসেন্টার গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রেটি হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ টেক কানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলনে তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং হুয়াওয়ের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে ‘এআই: বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতি, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় মূল ফোকাস ছিল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক বিস্তার। এতে আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) লি জিয়াং (টনি) বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক বাধা হলো উপযোগী মোবাইল ডিভাইসের অভাব। আগামী ১২ মাসের মধ্যে চীনের অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন লো-এন্ড ৪জি স্মার্টফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় অপারেটরদের সঙ্গে নিয়ে নেটওয়ার্কের মান ও ৫জি কাভারেজ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশে এআই কনটেন্টের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে লি জিয়াং জানান, চীনে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ট্রিলিয়ন টোকেন ব্যবহৃত হচ্ছে, যার অর্ধেকের বেশি খরচ হয় এআইভিত্তিক শর্ট ড্রামার মতো কনটেন্টে। আগামী এক বছরের মধ্যে অংশীদারদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষায় এআই শর্ট ড্রামা ও কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, এআই কর্মসংস্থান ধ্বংস করবে না, বরং কাজের ধরণ বদলে দিয়ে স্থানীয় নির্মাতা ও শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া হাসপাতালে এক্স-রে বিশ্লেষণ বা কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মাননিয়ন্ত্রণে উচ্চগতির ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই যুগের জন্য দেশে বড় সক্ষমতার ডেটাসেন্টার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ১০ হাজার জিপিইউ বা এনপিইউ কার্ডের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া শুধু অবকাঠামো দিয়ে রূপান্তর সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করেন।

অধিবেশনে জিএসএমএ এশিয়া প্যাসিফিকের পলিসি অ্যান্ড স্পেকট্রাম স্ট্র্যাটেজি ডিরেক্টর আশীষ গর্গ বলেন, এআই সেবা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হবে মোবাইল নেটওয়ার্ক। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে তিনি জানান, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। দেশে ৯৯ শতাংশ ৪জি কাভারেজ থাকলেও এআই ব্যবহারের ফলে যে বিপুল ডেটা ট্র্যাফিক তৈরি হবে, তা সামাল দিতে ৪জি যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশে জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ ৫জি কাভারেজের আওতায় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ৮৫ শতাংশ মানুষ সামাজিক মাধ্যম ও বিনোদনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষা ও আয়ের উদ্দেশ্যে এটি কাজে লাগান। পড়ার ও লেখার দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে এআই মডেলগুলোকে বাংলায় রূপান্তর করার পাশাপাশি ভয়েস বা অডিও-ভিত্তিক করতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তা ব্যবহার করতে পারে। ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তাইবুর রহমানের সঞ্চালনায় এ অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. তৌফিকুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।

এর আগে ‘ভবিষ্যত প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’ শীর্ষক প্রথম প্যানেল আলোচনায় আলোচকেরা ডিজিটাল সংযোগকে শুধু ইন্টারনেট বা প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা হিসেবে মূল্যায়নের আহ্বান জানান। তারা বলেন, ডিজিটাল সংযোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করে এর মাধ্যমে মানুষ কতটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা মানুষের কাছে কতটা সহজে পৌঁছাচ্ছে, তার ওপর। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ডিজিটাল সংযোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং এর সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানোর বিষয়ে তাঁরা মত দেন।

‘শিল্পখাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ শীর্ষক দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনায় দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ, নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচকেরা বলেন, পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোকে বাস্তব পর্যায়ে রূপান্তর করতে নেতৃত্ব, অর্থায়ন ও দক্ষ কর্মীর ঘাটতি দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএসটি//