৩ বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধ কতটা বদলে দিয়েছে গাজাকে

হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় যে গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে যে তা আর চেনাই যাচ্ছে না। ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান ও স্থল হামলার ফলে গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে। এই যুদ্ধ ঘরবাড়ি ও জনবসতি ধ্বংস করার পাশাপাশি […] The post ৩ বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধ কতটা বদলে দিয়েছে গাজাকে first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

৩ বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধ কতটা বদলে দিয়েছে গাজাকে
৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:০০  

হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় যে গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে যে তা আর চেনাই যাচ্ছে না।

ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান ও স্থল হামলার ফলে গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে। এই যুদ্ধ ঘরবাড়ি ও জনবসতি ধ্বংস করার পাশাপাশি সেখানকার অবকাঠামো ও জরুরি পরিষেবাগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এই যুদ্ধ প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বারবার বাস্তুচ্যুতি ও এলাকা ছাড়ার নির্দেশের ফলে পরিবারগুলো তাদের আবাসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৭৪,২৪৫ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও তা মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ১,৪৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজা উপত্যকা জুড়ে ইসরায়েলি হামলা ও অন্যান্য সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সেই সঙ্গে খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয়তা জোগাড় করা এখন নিত্যদিনের এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

দৈনন্দিন জীবন টিকিয়ে রাখার লড়াই

গাজার বাসিন্দাদের জন্য এই যুদ্ধ কেবল তাদের বসবাসের স্থানই পরিবর্তন করেনি, বরং দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ কাজগুলো করার পদ্ধতিকেও বদলে দিয়েছে।

বাসস্থান, সচল পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ এবং যাতায়াতের মাধ্যম-অর্থাৎ প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলো গাজার অনেক ফিলিস্তিনির কাছে এখন আর নেই।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে গাজার জনসংখ্যার ৯৪ শতাংশেরই জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। একই সময়ে, ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। ইসরায়েলি হামলা কিংবা জোরপূর্বক এলাকা ত্যাগের নির্দেশের কারণে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এসব মানুষের আশ্রয়স্থলগুলো আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে খুব একটা সুরক্ষা দিতে পারছিল না।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, অনেক পরিবারের কাছেই পর্যাপ্ত বিছানাপত্র, আলোর ব্যবস্থা, রান্নার সরঞ্জাম এবং স্যানিটেশন বা স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার অভাব রয়েছে।

পানি প্রাপ্তি আরেকটি নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুর দিকে জরিপকরা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশই মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার পানি-সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। অথচ জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও একইভাবে অনিশ্চিত। গাজায় কোনো কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড সচল নেই; ফলে জরুরি পরিষেবা এবং সাধারণ পরিবারগুলোকে জেনারেটর এবং ক্রমশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠা জ্বালানি, ইঞ্জিন অয়েল ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিবহন, ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ এবং মৌলিক পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টিকেও আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর ফলে দৈনন্দিন জীবন এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। পানি সংগ্রহ, ফোন চার্জ দেওয়া, রান্না করা, ধোয়ামোছা এবং বিভিন্ন পরিষেবার প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত এসব কিছুর জন্যই এখন এমন সব সম্পদ ও পরিকল্পনার প্রয়োজন হচ্ছে, যা আগে কখনোই দরকার ছিল না।

উন্মুক্ত রড ও ধ্বংসস্তূপে ঘেরা একটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তি ও কয়েকজন শিশু। রয়টার্স

অর্থনৈতিক বিপর্যয়

যুদ্ধের কারণে গাজার অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর আয় কমে গেছে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)-এর সেপ্টেম্বর মাসের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং বেকারত্বের হার ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্পখাত তাদের ২০২২ সালের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬ শতাংশ নিয়ে কার্যক্রম চালিয়েছে, আর নির্মাণ খাতের কার্যক্রম নেমে এসেছে ১ শতাংশে।

অর্থনৈতিক এই ধসের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পণ্য চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ গাজার অর্থনীতির ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ঐতিহাসিকভাবেই বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাদের অধিকাংশ বাণিজ্য ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত পথগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছিল।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে পণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল।

কর্মসংস্থান ও আয় হারিয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন মূলত ত্রাণ সহায়তা, ঋণ এবং ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক রামি আল-জাইঘ আল-জাজিরাকে বলেছেন, এই যুদ্ধ সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। এর ফলে পুরোনো পেশাগুলো আবার ফিরে আসছে এবং সাধারণ যন্ত্রপাতি ও হাতের কাছে থাকা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে নতুন ধরনের কাজের সৃষ্টি হচ্ছে।

গাজার অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর দেওয়া নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করছে। তবে নগদ অর্থের সংকট তীব্র হওয়ায় মানুষ এখন ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ওয়ালেট ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

শিক্ষাব্যবস্থার অচলাবস্থা

যুদ্ধ গাজার শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে হাজার হাজার শিশু সশরীরে স্কুলে যাওয়ার নিয়মিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কারণ অনেক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে, আর যেসব স্কুল এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকগুলোকেই আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষে ফেরার পরিবর্তে অনেক শিশু এখন তাঁবু ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। প্রায় ২ লাখ শিশুর শিক্ষার কোনো সুযোগই নেই।

এই বিঘ্নিত পরিস্থিতির ফলে শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যও বেড়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মৌলিক দক্ষতা হারানো এবং শিক্ষাগত ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান নিয়ে সতর্ক করেছে; কারণ টানা প্রায় তিন বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় একটি পুরো প্রজন্মের দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগত ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।

গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে একটি দাতব্য রান্নাঘর থেকে খাবার সংগ্রহের জন্য ফিলিস্তিনিরা জড়ো হয়েছেন। রয়টার্স

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত

গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সবকটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল চালু রয়েছে। এর কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।

যে কয়েকটি হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্র এখনো চালু আছে, সেগুলো জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগ নির্ণয়ের উপকরণ এবং জ্বালানির তীব্র সংকটের মধ্যে ধুঁকছে। এই সংকটের ফলে ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

গাজার বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সীমিত। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২,৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আরও হাজার হাজার রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন, যা গাজা উপত্যকার ভেতরে পাওয়া সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার এই বিপর্যয় এবং জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত সেপ্টেম্বরে সতর্ক করেছিল যে, অতিরিক্ত জনসমাগম এবং অপর্যাপ্ত আশ্রয়, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, ক্রমবর্ধমান এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রস্তুত নয়। তাই তারা নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ, জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর পুনর্বাসন এবং রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাইরে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

সংকুচিত হতে থাকা পরিসর

যুদ্ধের ফলে গাজার ভৌগোলিক বিন্যাস বদলে গেছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে এই ভূখণ্ডটি খণ্ডিত হয়ে পড়েছে; এর ফলে ফিলিস্তিনিরা ক্রমশ ছোট একটি এলাকায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং তাদের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও জরুরি পরিষেবা-কেন্দ্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ হলো গাজার অভ্যন্তরে একটি সামরিক সীমানা রেখা, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অবস্থান ও চলাচলে বিধিনিষেধযুক্ত এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির আওতায় এটি নির্ধারণ করার পর থেকে ইসরায়েল রেখাটিকে জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও গভীরে সরিয়ে নিয়েছে, যার ফলে পরিবারগুলোকে তাদের বসতভিটা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসে ‘ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর’ জানায় যে, ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের বিধিনিষেধ গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর ফলে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি গাজা উপত্যকার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই পরিবর্তনের অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ হলো রাফাহ। গাজার দক্ষিণে মিসর সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই শহরটি যুদ্ধের সময় উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া ১০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে ৮ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বর্তমানে রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা ‘মাওয়াসি রাফাহ’ ছাড়া প্রায় পুরো শহরটিই ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার ফলে শহরটি থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তাদের বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না।

গাজার বাসিন্দারা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎবিহীন জীবনযাপন করছেন। রয়টার্স

নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে হামাস গাজার শাসনকার্য পরিচালনা করে আসছিল। তারাই সেখানকার বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখাশোনা করত। যুদ্ধ সেই ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, যার ফলে গাজার বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

জুলাই মাসে হামাস ঘোষণা করেছিল যে, তারা ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা’ (এনসিএজি)-এর কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার আওতায় গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট বা বিশেষজ্ঞ-ভিত্তিক একটি সংস্থা হলো এই এনসিএজি। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই প্রক্রিয়াটি এখনও সম্পন্ন হয়নি।

যুদ্ধ জনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী বারবার পুলিশ সদস্য ও নিরাপত্তা চৌকিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে; এতে ৩৫ জন পুলিশ সদস্যসহ মোট ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জনশাসন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

একইভাবে, ‘প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস’ সতর্ক করেছে যে, পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর হামলার ফলে গাজার বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে সেখানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং অপহরণ, সম্পত্তির ওপর হামলা ও মানবিক সহায়তা সামগ্রী লুটপাটের মতো ঘটনা বাড়ছে।

গাজার বাসিন্দাদের জন্য, তিন বছরের এই যুদ্ধ এক গভীর অনিশ্চয়তা রেখে গেছে-যেখানে ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট পথ বা দিকনির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না।

The post ৩ বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধ কতটা বদলে দিয়েছে গাজাকে first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.