গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নয়
জনগণের নিরাপত্তার জন্য সাইবার সুরক্ষা আইন
- জনগণকে নিরাপদ রাখতেই সাইবার সুরক্ষা প্রয়োজন বলে মন্তব্য প্রতিমন্ত্রীর
- সাংবাদিকদের আইনের আওতায় আনতে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব বিবেচনায়
- গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করছে সরকার
সাইবার নিরাপত্তাকে কেবল নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং নাগরিক ও সাংবাদিকদের ডিজিটাল পরিসরে নিরাপদ রাখার কাঠামো হিসেবে দেখছে সরকার—এমন অবস্থান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, গণমাধ্যমের লেখা বন্ধ করা বা সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাইবার সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে না।
৪ অক্টোবর, রবিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের বাক্স্বাধীনতায় সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। গণমাধ্যম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করছে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তাঁর মতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “গণমাধ্যমকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলে আইন লাগে না। আওয়ামী লীগ সরকার এজেন্সির মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করত। এজেন্সির মাধ্যমে বিএনপি সরকারের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নই আসে না।”
তিনি জানান, সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ, সাংবাদিকদের স্বার্থ এবং গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার সমুন্নত রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সাংবাদিক আটকে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব
সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার পরামর্শ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের মতামত নেওয়া হবে।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রস্তাবটি হলো—কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল বা নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালে ভুলক্রমে এমন কোনো বিষয় প্রকাশিত হলে, যা সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যত্যয় ঘটায়, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে আইনের আওতায় আনার আগে আদালতের অনুমতি নিতে হবে।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সরকার প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। এটি আইনে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং এর ভাষা কেমন হবে, তা নিয়েও পর্যালোচনা চলছে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে আদালতের অনুমতির বিষয়টি সাম্প্রতিক আইন সংস্কার আলোচনাতেও উঠে এসেছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের সরকারি পরামর্শ সভায় সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, যার মাধ্যমে খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইনে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত সুরক্ষা বিধান পর্যালোচনা করার কথা জানানো হয়েছে।
ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল হয়রানি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে মানুষকে হয়রানি ও হেনস্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ ধরনের হয়রানির কারণে অনেকে আত্মহত্যাপ্রবণ পর্যায়েও চলে যাচ্ছেন।
একইভাবে সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাই শুধু সাধারণ নাগরিক নয়, সাংবাদিকদেরও ডিজিটাল পরিসরে নিরাপদ রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্যও সরকার কাজ করছে। সাংবাদিকরা যেন নিরাপদ পরিবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়টিও উঠে আসে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। নবম ওয়েজ বোর্ড এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
সাংবাদিক নেতারা দশম ওয়েজ বোর্ডের আগে নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিষয়টি মন্ত্রিসভায়ও তোলা হবে।
তবে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি গণমাধ্যম মালিকদেরও আন্তরিক হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা মালিকপক্ষ বাস্তবায়ন না করলে সাংবাদিকরা এর সুফল পাবেন না বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
সাংবাদিকের পেশাগত সংজ্ঞা নির্ধারণ
সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় ও পেশাগত সংজ্ঞা নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, কারা সাংবাদিক এবং কাদের সাংবাদিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা বা নীতিমালা প্রয়োজন।
অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়ের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য যেমন হুমকি, তেমনি জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি।
এ বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের পেশাগত পরিচয় স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
সভা শেষে সাংবাদিক নেতাদের তাদের দাবি ও প্রস্তাবগুলো লিখিতভাবে দেওয়ার আহ্বান জানান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী। লিখিত প্রস্তাব পাওয়া গেলে দাবিগুলো বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সরকারের জন্য সহজ হবে বলে জানান তিনি।
//ডিবিটেক/জেএনও/এসএমপি/পিসিবি//





