ঢোল-মাদলের ছন্দে মুখরিত ‘কারাম উৎসব’
নওগাঁ: পায়ে আলতা, খোঁপায় বাহারি ফুল, আর লাল-হলুদ শাড়ির রঙিন আবহে চারপাশ যেন মেতে উঠেছিল এক অন্যরকম উৎসবে। ঢোল, মাদল আর মন্দিরার রিনঝিন সুরে মুখরিত মাঠ- সবমিলিয়ে জীবনের ক্লান্তিভরা যান্ত্রিকতাকে পেছনে ফেলে সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাণের উৎসব ‘কারাম উৎসব’ নিয়ে এলো রঙের এক নতুন ছোঁয়া। প্রকৃতির বন্দনা আর নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি […] The post ঢোল-মাদলের ছন্দে মুখরিত ‘কারাম উৎসব’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

নওগাঁ: পায়ে আলতা, খোঁপায় বাহারি ফুল, আর লাল-হলুদ শাড়ির রঙিন আবহে চারপাশ যেন মেতে উঠেছিল এক অন্যরকম উৎসবে। ঢোল, মাদল আর মন্দিরার রিনঝিন সুরে মুখরিত মাঠ- সবমিলিয়ে জীবনের ক্লান্তিভরা যান্ত্রিকতাকে পেছনে ফেলে সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাণের উৎসব ‘কারাম উৎসব’ নিয়ে এলো রঙের এক নতুন ছোঁয়া। প্রকৃতির বন্দনা আর নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার এই আয়োজন পরিণত হয়েছিল এক মিলনমেলায়।
বৃহস্পতিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের আয়োজনে পত্নীতলা উপজেলার ঐতিহাসিক মাঠে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেবল আদিবাসী সম্প্রদায়ই নয়, এই বৈচিত্র্যময় উৎসবের রূপ দেখতে ভীড় জমিয়েছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শেকড়ের টানে প্রবীণরাও মজেছিলেন তরুণদের সঙ্গে।
রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ওঁরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল, মাহাতো ও হাঁড়িসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষেরা এতে অংশ নেন। এ আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিল নিজস্ব মাতৃভাষায় গাওয়া সমবেত গান আর ছন্দময় নৃত্য। নাচের তালে তরুণ-তরুণীরা ফুটিয়ে তোলেন তাদের হারিয়ে যেতে বসা ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।
জানা যায়, কারাম মূলত খিল কদম ডাল পূজাকে কেন্দ্র করে পালিত এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে, মাঠে ধান রোপণের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর যুগ যুগ ধরে এই উৎসব পালন করে আসছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। উৎসবের আগের দিন সন্ধ্যায় গ্রামের অবিবাহিত তরুণীরা জঙ্গল থেকে পবিত্র ‘কারাম’ বা খিল কদম গাছের ডাল কেটে নিয়ে আসেন। তাদের গাঢ় বিশ্বাস, কারাম উৎসব জীবনে সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং সকল অভাব ও গ্লানি দূর করে। মূলত এর মধ্য দিয়েই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বন্দনা জানানো হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, উৎসবের দিন সকালে নির্দিষ্ট মাঠে ডাল পুঁতে তাতে নানা রঙের ফুল ও নতুন গামছা পরানো হয়। বাঁশের ডালায় রাখা বালুমিশ্রিত মাটিতে বিভিন্ন শস্যের বীজ রেখে প্রদীপ জ্বালিয়ে চলে বিশেষ পূজা-অর্চনা। এরপর ঢোল-মাদলের তালে চলে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষার গান ও মনোমুগ্ধকর নাচ। দিনশেষে তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষ নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেই ডাল নিকটস্থ পুকুরে বিসর্জনের মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি টানেন।
উৎসে অংশ নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা জানান তরুণ প্রজন্ম। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তরুণী রিয়া পাহাড়ি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে আমরা দারুণ খুশি। তবে শুধু একবার নয়, আমাদের এই প্রাণের উৎসব টিকিয়ে রাখতে এমন আয়োজন আরও বেশি বেশি হওয়া দরকার।’
একই সুর যুবকের কণ্ঠেও। যুবক সুজিত উরাও বলেন, ‘শেকড়কে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে আমাদের প্রজন্ম সবসময় পাশে থাকবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের এই সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে।’
উৎসবের সার্বিক শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে কথা হয় আদিবাসী সমাজকর্মী ও গবেষক বিশ্বনাথ সিংয়ের সাথে। তিনি জানান, কারাম পূজা আমাদের আবহমানকালের ঐতিহ্য। প্রাকৃতিকভাবেই আদিবাসীরা পরিবেশের পূজারি। এই উৎসব আমাদের প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্কের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। তবে সময়ের সাথে সাথে শহুরে সংস্কৃতি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের এই মৌলিক উৎসবগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।
আয়োজকদের মতে, সংস্কৃতির এই শেকড়গুলো আগামী দিনের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
The post ঢোল-মাদলের ছন্দে মুখরিত ‘কারাম উৎসব’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





