সায়েম স্যারকেই চান চুয়েট শিক্ষার্থীরা
‘এটাই একমাত্র দাবি’
- ৫৬ দিনের দায়িত্বে আস্থা তৈরির দাবি শিক্ষার্থীদের
- গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তাঁরা
- পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানান, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল করাই তাঁদের একমাত্র দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের দাবির ভিত্তি শুধু অধ্যাপক সায়েমের ৫৬ দিনের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নয়। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর তৈরি হওয়া যোগাযোগ ও আস্থা, নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাই তাঁদের আন্দোলনের মূল বিষয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অরিন্দম দে, মাহতাব হক, সাকিব হাসান ও মাহিরা তাজরি।
মাহিরা তাজরি বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব অল্প সময়েই তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য একজন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনেছেন, সরাসরি কথা বলেছেন এবং কোনো সমস্যা তার কাছে তুলে ধরা হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখে সমাধানের পথ খোঁজার আন্তরিকতা ও স্পৃহা দেখিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর এই সরাসরি সম্পৃক্ততাই অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি দৃঢ় আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছে।”
অধ্যাপক সায়েমের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সহায়তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সাকিব হাসান। তিনি বলেন, “অধ্যাপক সায়েম স্যার ২০০৫ সালে চুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ এই সময়ে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল শিক্ষার্থীরা।”
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন অফিস চালু, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক গবেষণা হাব, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরির মতো বিভিন্ন পরিকল্পনা তিনি সামনে এনেছিলেন।”
অধ্যাপক সায়েমের দায়িত্বকালে শুরু হওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সাকিব। তিনি বলেন, “চুয়েটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্লাব ফেস্ট আয়োজনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। পাশাপাশি ‘ডিফেন্স এনালাইসিস ও উইং’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক চাকরির ক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টাও চলছিল।”
৫৬ দিনের দায়িত্বকালকে শিক্ষার্থীরা কীভাবে দেখছেন, তা ব্যাখ্যা করেন মাহতাব হক। “তাহলে ৫৬ দিন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?”—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “৫৬ দিন কোনো উপাচার্যের পূর্ণ মেয়াদ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু একজন প্রশাসক শিক্ষার্থীদের কথা শুনবেন কি না, সংকটে পাশে দাঁড়াবেন কি না, সমস্যা জানালে সমাধানের চেষ্টা করবেন কি না এবং নিজের নেটওয়ার্ক ও অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার্থীদের সুযোগ তৈরিতে ব্যবহার করবেন কি না—এই মানসিকতা বুঝতে ৫৬ দিন একেবারে অপ্রতুলও নয়। আমরা এই অল্প সময়েই সেই মানসিকতার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছি।”
মাহতাব হক বলেন, “আমাদের আন্দোলন শুধু ৫৬ দিনের একজন উপাচার্যকে ঘিরে নয়। আমরা এমন একজন শিক্ষক ও প্রশাসকের কাজের ধারাবাহিকতা চাই, যাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি দৃশ্যমান আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। হঠাৎ ও ব্যাখ্যাহীন পরিবর্তনে সেই আস্থা ও চলমান উদ্যোগগুলো থেমে যাক—আমরা সেটিই মেনে নিতে পারছি না। ৫৬ দিনেই আমরা সায়েম স্যারের কাজের ধরন দেখেছি, আমরা উপাচার্য হিসেবে তাঁকেই চাই।”
তিনি আরও বলেন, “সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে আমরা কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না। অধ্যাপক সায়েম স্যারের দৃশ্যমান কাজ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আস্থা এবং চলমান উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই আমরা তাঁর পুনর্বহাল চাই।”
গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ এবং অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেন অরিন্দম দে। তিনি বলেন, সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানানো হলেও প্রজ্ঞাপনে এর কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
অরিন্দম দে বলেন, “আমাদের আপত্তি নতুন উপাচার্যকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নয়; কোনো দৃশ্যমান ব্যাখ্যা ছাড়াই অধ্যাপক সায়েম স্যারকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।”
তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং উপাচার্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়—অধ্যাপক সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এর ধারাবাহিকতায় ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন ও গণ-অবস্থান কর্মসূচি চলছে।”
অরিন্দম দে আরও বলেন, “আজ সরকারি ছুটির দিনেও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে গণ-অবস্থানে রয়েছেন। মূল ফটকে তালা দিয়ে শাটডাউন কার্যকর রাখার পাশাপাশি গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও চলছে।”
আন্দোলনকে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত না করার আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা। অরিন্দম দে বলেন, “কিছু সংবাদ প্রতিবেদন, শিরোনাম ও ব্যক্তিগত বক্তব্যে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় দ্বন্দ্বের কাঠামোয় উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আমরা এমন সাধারণীকরণ ও অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছি।”
শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। তাঁদের দাবি, সদ্য জারি করা উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন, গণ-অবস্থান, গণস্বাক্ষর ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তাঁরা।
//এফকেসিটি/এএইচসি/এমআইএসটি//





