বাংলাদেশ ব্যাংকের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ; এলসি ও ডকুমেন্টারি কালেকশনের নথি হবে ডিজিটালি আদান-প্রদান, কমবে সময় ও ব্যয়

আমদানি-রপ্তানিতে ডিজিটাল নথির যুগ শুরু

  • এলসি ও ডকুমেন্টারি কালেকশনের দলিল ইলেকট্রনিকভাবে আদান-প্রদানের সুযোগ
  • নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক নয়, তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
  • অংশ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক

আমদানি-রপ্তানিতে ডিজিটাল নথির যুগ শুরু
৩ জুলাই, ২০২৬ ১০:০৯  

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে আমদানি-রপ্তানির নথি ডিজিটালভাবে আদান-প্রদানের পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ উদ্যোগের আওতায় বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনুমোদিত (এডি) ব্যাংকগুলো ঋণপত্র (Letter of Credit-LC) এবং ডকুমেন্টারি কালেকশনের আওতায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক দলিল ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ ও বিনিময় করতে পারবে।

বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনুমোদিত সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। নির্দেশনা জারির সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক এই কর্মসূচির লক্ষ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান বজায় রেখে Electronic Transferable Records (ETR) নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করা।

নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্ট ব্যবস্থাপনায় কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ব্যাংকগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি নির্বাচন করতে পারবে।

তবে ব্যবহৃত প্রযুক্তিকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং তথ্যের গোপনীয়তা, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্যের মালিকানায় থাকবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সংবেদনশীল বাণিজ্যিক তথ্যের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট তথ্যের মালিকের কাছেই থাকবে। এসব তথ্য কোনো শেয়ার্ড বা পাবলিক অবকাঠামোতে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়।

এতে ব্যবসায়িক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা সহজ হবে এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে।

কাগজের বিকল্প হবে ডিজিটাল নথি

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত মানদণ্ড পূরণ হলে ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্টকে কাগজভিত্তিক নথির আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এর মাধ্যমে প্রযুক্তিনিরপেক্ষ, নিরাপদ ও বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized) যাচাইভিত্তিক একটি আধুনিক ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।

অংশ নিতে লাগবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন

পরীক্ষামূলক এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আগে প্রতিটি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য করিডোর, বিদেশি অংশীদার, লেনদেনের ধরন, ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে।

যেসব নথি ডিজিটাল হবে

নতুন ব্যবস্থার আওতায় ইনভয়েস, বিল অব লেডিং, এয়ারওয়ে বিল, ড্রাফট, প্যাকিং লিস্ট, সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নথি ইলেকট্রনিকভাবে তৈরি, প্রক্রিয়াকরণ ও আদান-প্রদান করা যাবে।

তবে যেসব দেশে ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্ট এখনো আইনগত স্বীকৃতি পায়নি, সেসব ক্ষেত্রে প্রচলিত কাগজভিত্তিক দলিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তায় কঠোর নির্দেশনা

বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো ব্যবস্থায় শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

এ জন্য এনক্রিপশন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ডিজিটাল স্বাক্ষর, অডিট ট্রেইল এবং তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা আরও নির্ভরযোগ্য, দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

ডিজিটাল ট্রেডে নতুন ধাপ

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পাইলট কর্মসূচি সফল হলে দেশের ট্রেড ফাইন্যান্স খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। কাগজভিত্তিক নথি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে ডিজিটাল দলিল ব্যবহারের ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সময় কমবে, ব্যয় হ্রাস পাবে এবং জালিয়াতির ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংযুক্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্রেড ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে।

//ডিবিটেক/জেএন/ইকে//