অন্তর্ভূক্তিমূলক ডিজিটাল রূপান্তরে মেস থেকে স্টার মডেলে সরকার
বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের তথ্য ভিয়েতনামের কোম্পানির কাছে?
বিচ্ছিন্নভাবে করা ডিজিটাল উন্নয়নগুলোকে অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিয়ে উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জোর দিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এজন্য ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করণ এবং ডেটার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরমার্শ তাদের। প্রযুক্তিবিদরা মনে করেন ডিজিটাল উন্নয়নে সাইবার নিরাপত্তায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আর সেদিকটায় লক্ষ্য রেখে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে মেস থেকে স্টার মডেলে পা রেখেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে ভ্যাট অনলাইনের কাজ ভিয়েতনামের একটি কোম্পানিকে দিয়ে করানোয় ডেটার সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে।
ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রক্ষেপনের স্বপ্ন থেকে বাস্তবায়ন’ বিষয়ক সেমিনারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন ব্যক্তরা। ২৮ জানুয়ারি, বুধবার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের উইন্ডি টাউনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব।
আলোচনার সময় ডেটা গভর্নেন্সের আইনি কাঠামো বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই এই আইনগুলো পাশ হয়েছে। এখন কর্তৃপক্ষ গঠন করে বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এপিআই দিয়ে নাগরিক সেবা টেস্ট করা হয়েছে। তবে বিপুল তথ্য নিয়ে কাজ করতে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আগামী মার্চে কাজ শুরু হবে। এস্তোনিয়ার মডেলে খরচ বেশি হওয়ায় আমরা কেন্দ্রীয় ডাটা এক্সচেঞ্জ তৈরি করবো। বর্তমানে থাকা মেস মডেল থেকে স্টার মডেলে যাবো। এই স্টারে সবাই কানেক্টেড হতে পারবেন। এখন বিচ্ছিন্নভাবে এআই মডেলে কাজ হলেও আমরা ন্যাশনাল ইন্টার-অপারেবিলিটি পদ্ধতিতে কাজ করতে পারবো।
বিগত সময়ে কানেক্টিভিটিতে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সেবা অবহেলিত ছিলো অভিযোগ করে ফয়েজ আহমাদ তৈয়্যব বলেন, ‘কনেক্টিভিটি বাড়াতে আমরা ফাইবারকে পানির দামে সস্তা করতে কাজ করছি। মোবাইল কোম্পানিকে বিনিয়োগে ফোর্স করা হচ্ছে। পরিচয় বা বিনিময় -এর মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করা হলেও এখন ওয়ান আইডি লাগবে। এজন্য এনাইডিকে রিক্রিয়েট করে করার চেষ্টা করছি। এটি বাস্তবায়নে এজন্য এমন একটি অ্যালগরিদম লাগবে যে বলবে কোনও ডেটা পরিবর্তন করা যাবে না বার্তা দেবে। আর পরিবর্তনশীল তথ্য ব্লক চেইন ব্যবহার করা হবে।’।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেলার সহযোগী হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মামুনুর রশীদ ভূইয়া। উপস্থাপনায় তিনি বিচ্ছিন্নভাবে রূপান্তরের খেসারত তুলে ধরে ডিপিআই বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। একইসঙ্গে টার্গেট পূরণ না হলে কোনো ছাড় দেয়া উচিত নয় বলে মত দেন। তিনি জানান, সরকার এখন অন্তর্ভূক্তিমূলক ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে মেস থেকে স্টার এবং তারপর স্টার মেস ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করছে। তখন পাবলিক-প্রাইভেট ডেটা সেন্টারগুলোরে মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা হবে।
আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সঞ্চালনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) জাহেদা পারভীন, শিক্ষাবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির এবং স্পেকট্রাম সফটওয়্যার অ্যান্ড কনসালটিং লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার মুশফিকুর রহমান।
বক্তব্যে নাগরিক সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ডিপিআই থেকে ইন্টার অপাবিলিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন জাহেদা পারভীন। তিনি বলেন, অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের বিষয়ে সরকার অধ্যাদেশ করেছে। এই অধ্যাদেশ বিষয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অবহিত করা দরকার। অপরদিকে এপিআই কেন্দ্রিক উন্নয়নের চেয়ে প্রসেস ইন্টারঅপারেবিলিটিতে গুরুত্বারোপ করেছেন ডঃ আব্দুর রাজ্জাক। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পেশাদারদের দক্ষতা উন্নয়নে কর্মসূচি গ্রহণে জোর দিয়েছেন তিনি। বিজনেস প্রসেসের সঙ্গে প্রযুক্তির বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে মুশিফুর রহামন বলেছেন, দেশে টেলিকমের বাইরে হেলথ টেক, এগ্রিটেকের মতো বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। অথচ টেকসই ভবিষতের জন্য ডেটা নির্ভর সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। ডেটার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সৈয়দ আলমাস কবির বলেছেন, দেশের সফটওয়্যার সেবাদাতাদের ওপর সরকারের আস্থাহীনতা ও দূরত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমাদের ভ্যাট অনলাইনের অটোমেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনামের একটি কোম্পানির কাছে। ওই দেশেরই একটি কোম্পানির কাছে আমাদের প্রতিটি ব্যবসায়ীদের তথ্য রয়েছে। তাই এই ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভেন্ডর-বায়ার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রদর্শনী চলাকালে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরও ৪ টি সেমিনার এবং ৪টি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সেমিনারে দেশের বরেণ্য তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করবেন। প্রতিদিনই থাকবে বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের বিশেষায়িত প্রদর্শনী ও কুইজ প্রতিযোগিতা। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের আওতায় থাকবে, যা দর্শনার্থীদের এই অত্যাধুনিক ইন্টারনেট প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।
ডিবিটেক/আইএইচ/ইকে



