নিলাম নয়; নিয়ম মেনেই গ্রামীণফোনকে ‘স্বর্ণালী তরঙ্গ’ বরাদ্দ
মার্চে ইজিএসএম নিলামের সম্ভাবনা!
একক অপারেটরের সেবার মান উন্নয়নের প্রয়াসে অপর অপারেটরদের গ্রাহকদের সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে—এই আশঙ্কায় এক বছর আগে ইজিএসএম ব্যান্ডে ৮৫০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ পায়নি দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন। সে সময় অন্যান্য অপারেটরদের আপত্তির মুখে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, স্পেকট্রাম বরাদ্দে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই নিয়ন্ত্রকের মূল লক্ষ্য।
এই প্রেক্ষাপটেই গত ১৪ জানুয়ারি ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলামের ঘোষণা দেয় বিটিআরসি। লো-ব্যান্ড হিসেবে পরিচিত এই ব্যান্ড গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কম খরচে বেশি কাভারেজ দিতে অত্যন্ত কার্যকর হওয়ায় মোবাইল অপারেটরদের কাছে একে ‘স্বর্ণালী তরঙ্গ’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
নিলামের কাঠামো ও মূল্য নির্ধারণ
৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে মোট ৪৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ থাকলেও এর মধ্যে ২০ মেগাহার্টজ নিয়ে আইনি জটিলতা চলমান থাকায় নিলামে তোলা হয় ২৫ মেগাহার্টজ। বিটিআরসি শুরুতে প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে ২৬৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে প্রতি মেগাহার্টজের মোট ভিত্তিমূল্য দাঁড়ায় ২৮৪ কোটি টাকা।
তবে এই মূল্য নিয়ে অপারেটরদের আপত্তি তৈরি হয়। তাদের যুক্তি ছিল, ২৮ বছর আগে ধার্য করা ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে প্রতি মেগাহার্টজের দাম যেখানে ২৬৩ কোটি টাকা, সেখানে প্রযুক্তিগত ও বাজার বাস্তবতার পরিবর্তন সত্ত্বেও একই মূল্যে ৭০০ মেগাহার্টজ নির্ধারণ অযৌক্তিক। অপারেটরদের আপত্তির মুখে বিটিআরসি পরে প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য কমিয়ে ২৩৭ কোটি টাকা ঘোষণা করে।
অপারেটরদের সরে দাঁড়ানো
মূল্য সংশোধনের পরও নিলামে অংশ নেয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক ও বাংলালিংক। শেষ পর্যন্ত রবি আজিয়েটাও তাদের আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে নিলামে একমাত্র দরদাতা হিসেবে থেকে যায় গ্রামীণফোন।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের জারি করা সংশোধিত নিলাম নির্দেশিকা অনুযায়ী একক দরদাতা হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম অর্জনের সুযোগ পায় গ্রামীণফোন। প্রতিযোগিতামূলক নিলাম আর অনুষ্ঠিত না হয়ে কমিশন সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘নিলাম নয়, সাজানো বরাদ্দ’—সমালোচনার ঝড়
এই সিদ্ধান্তের পরপরই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। অভিযোগ ওঠে, একক কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার্থেই নিলামের পরিবর্তে সংশোধিত নিয়মে বরাদ্দ দিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হাতছাড়া করা হয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, ২০২১ সালে ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড যে দামে বিক্রি হয়েছিল, ২০২৫ সালে এসে মুদ্রাস্ফীতি, স্মার্টফোন ব্যবহার এবং ডাটা চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার পরও কীভাবে একই দামে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাদের আরও যুক্তি, প্রতিবেশী দেশ ভারতে সমমানের তরঙ্গ প্রতি মেগাহার্টজ প্রায় ৪৭০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ প্রায় অর্ধেক দামে হস্তান্তর করা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্র সরাসরি বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
গ্রামীণফোনের ব্যাখ্যা
বিটিআরসি থেকে ১৫ বছরের জন্য মোট ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায় ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়ে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, এই তরঙ্গ বরাদ্দ সেবা-বঞ্চিত ও ইনডোর এলাকায় নেটওয়ার্ক কাভারেজ উন্নত করবে, নেটওয়ার্কের দক্ষতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াবে এবং ৮৫ দশমিক ৬ কোটির বেশি গ্রাহকের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল সেবা প্রদানে সক্ষমতা জোরদার করবে।
এমডির বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
এই বরাদ্দের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় আসে গত ৬ জানুয়ারি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে গ্রামীণফোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির আজমানের একটি বক্তব্য। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ (অ্যাপেটাইট) খুবই খুবই কম। এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ। আমি শুধু গ্রামীণফোনের প্রেক্ষাপট থেকে এই কথাটা বলছি না। আমি অ্যামটবের (মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন) প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্য অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রেও একই শঙ্কা দেখছি।”
এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে—অন্য অপারেটররা নিলামে অংশ না নিলেও গ্রামীণফোন কীভাবে বিনা নিলামে নতুন বিনিয়োগে এগোলো? এটি কি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “যে সাক্ষাৎকারের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে করের বোঝা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না—এমনটি বলা হয়েছিল। নতুন তরঙ্গ অপারেটরটির ৮ কোটি ৫৬ লাখের বেশি গ্রাহকের জন্য নিরাপদ ও উদ্ভাবনী ডিজিটাল সেবা প্রদানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকাকে আরও সংহত করবে।”
নিলাম থেকে সরে দাঁড়িয়ে রবি কি পিছিয়ে পড়লো?
৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড গ্রহণ না করার বিষয়ে রবি আজিয়েটার চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার ও কোম্পানি সেক্রেটারি শাহেদ আলম বলেন, “৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড আমাদের নেটওয়ার্কের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ ও বিবর্তনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত। তবে বর্তমান নেটওয়ার্ক অগ্রাধিকার, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও বাজার বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই নিলামের সময়সূচি আমাদের তাৎক্ষণিক পরিচালনাগত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি সার্বিক কারিগরি ও কৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমরা ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিলামে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের আবেদন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা বিস্তারে একক সেলের নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির কারণে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড অত্যাবশ্যক হলেও তা গ্রহণ না করে ৪জি/৫জি সেবার মান উন্নয়নে কতটা সক্ষম এবং গ্রামীণফোন একক ভাবে এই স্পেকট্রাম বরাদ্দ পাওয়ায় তারা কি পিছিয়ে গেলেন না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লো-ব্যান্ড ফ্রিকোয়েন্সি বলতে শুধু ৭০০ মেগাহার্টজই নয়, ৯০০ মেগাহার্টজও লো-ব্যান্ড। রবি ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ফ্রিকোয়েন্সি ধরে রেখেছে, যার মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৪জি নেটওয়ার্ক বিস্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭০০ ব্যান্ড সমর্থিত স্মার্টফোন মাত্র ৩৫ শতাংশ, আর ৯০০ ব্যান্ড সমর্থিত স্মার্টফোন প্রায় ৬৫ শতাংশ হওয়ায় রবির অধিকাংশ গ্রাহক ইতোমধ্যেই ৯০০ ব্যান্ডের সুবিধা পাচ্ছেন।
কী চায় বাংলালিংক
একই প্রশ্নের জবাবে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, “৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ব্যাপারে আমরা বেশ আগ্রহী ছিলাম। তবে দুঃখজনকভাবে প্রস্তাবিত মূল্য ও বরাদ্দ পদ্ধতি বাজারের বিদ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বর্তমান মূল্যস্তরে এই ব্যান্ড কেবলমাত্র শক্তিশালী আর্থিক ক্ষমতা সম্পন্ন অপারেটরের পক্ষেই গ্রহণযোগ্য, যার ফলে ছোট অপারেটরদের জন্য অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।”
‘তবে আমরা ইতোমধ্যে ইজিএসএম ব্যান্ডে স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য বিটিআরসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছি। এই ব্যান্ড আমাদের নেটওয়ার্ক কাভারেজ উন্নত করতে সহায়তা করবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কার্যকরভাবে টিকে থাকা নিশ্চিত করবে। আমরা আশা করি, বিটিআরসি এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে’- যোগ করেন তিনি।
বিটিআরসির ব্যাখ্যা ও মার্চের আশ্বাস
সবশেষ নিলাম না করে বরাদ্দ এবং অপারেটরদের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেন বিটিআরসির কমিশনার ও স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট কমিটির (এসএমসি) আহ্বায়ক মাহমুদ হোসাইন। তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতামূলক নিলাম করতেই একক বিডারের সীমা ১০ মেগাহার্টজে নামিয়ে আনা হয়। অপারেটরদের দাবি অনুযায়ী ভিত্তিমূল্যও কমানো হয়। কিন্তু অন্য অপারেটররা না আসায় সংশোধিত গাইডলাইন অনুযায়ী একক দরদাতাকে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়া করে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না এবং সংশোধিত গাইডলাইনের মাধ্যমে ২১ জানুয়ারি গ্রামীণফোনকে তরঙ্গ দেওয়ার সুপারিশ তার সাবেক প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতের ইঙ্গিত দেয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিলামের আগে দুই দফা গাইডলাইন সংশোধন করা হয়েছে। সেখানেই একক ভাবে বরাদ্দ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তাই নিলাম হয়নি। সিঙ্গেল বিডার হিসেবে বরাদ্দ দেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। আর আমি একক ভাবে এখানে কিছুই করিনি। করতেও পারি না। এটা কমিটি ও কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত। কমিশনাররা বসে বৈঠক করেছেন। ডি-নথিতে সব বিষয়েরই প্রমাণ রয়েছে। আইনি প্রসেসর ফলো করে ও কমিশনের ডক্যুমেন্টেড অনুমোদন নিয়ে করেছি।”
তিনি আরও জানান, বিটিআরসির আইনজীবী ও এডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল আনিক আর হক লিখিতভাবে বরাদ্দে কোনো আইনি বাধা নেই বলে মত দেওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি কমিশনের বৈঠকে এই সুপারিশ উত্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদন পেলে গ্রামীণফোন ১০ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের শর্তে ১৫ বছরের জন্য এই তরঙ্গ পাবে।
সব অপারেটরের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ইজিএসএম ব্যান্ডের নিলাম আয়োজনের কথাও জানান মাহমুদ হোসাইন। তার ভাষায়, আগামী মার্চ নাগাদ এই নিলাম শুরু করার লক্ষ্য নিয়েই প্রস্তুতি চলছে।
ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউ



