মোবাইলফোন আমদানি সহজ ও শুল্ক কমাতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক
আগামী ১৬ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এনইআইআর) চালুর আগে মোবাইল ফোন আমদানি শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ ও শুল্ক হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে অন্তবর্তীকালীন সরকার। এরই অংশ হিসেবে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হবে উচ্চ পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এই বৈঠকে অংশ নেবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিডা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
রাজস্ব ফাঁকি রোধসহ সিম সংক্রান্ত অপরাধ, আর্থিক লেনদেন, জুয়া, ফোন চুরি, ছিনতাই রোধসহ নানা ধরনের ডিজিটাল অপরাধ কমাতে নেয়া এনইআইআর বাস্তবায়নে সৃষ্ট বাধা দূর করতেই এমন সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত থাকলেও দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে বিদ্যমান ৫৭ শতাংশ শুল্ক-কে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ‘বিপর্যয় ডেকে আনা সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রয়কারীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ। ফলে এই সিদ্ধান্ত প্রতিহত করতে সারাদেশে মোবাইল ফোন বিক্রি বন্ধসহ নানা বিক্ষোভ করেছে আমদানিকারকেরা।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিগত কয়েকদিন ধরে একাধিক মোবাইল ফোন আমদানিকারকের সঙ্গে বৈঠক’ করার কথা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। সামনেও এই বৈঠক চলমান থাকবে জানিয়ে ২৫ নভেম্বর, মঙ্গলবার রাতে তিনি বলেছেন, ‘বিগত কয়েকদিন আমরা উনাদের মতামত অত্যন্ত মনোযোগসহকারে শুনেছি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিডা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে বৈধ মোবাইল ফোন আমদানির শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ ও যৌক্তিকীকরণ বিষয়ে হাই-লেভেল মিটিং ডাকা হয়েছে। এখানে মোবাইল ফোন আমদানির শুল্ক কমানো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের আশা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় বৈধ পথে মোবাইল ফোন আমদানি আরও সহনীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব হবে।’
‘আমরা দেশের মোবাইল আমদানিকারকদের আশ্বস্ত করতে চাই যে— বৈধ আমদানিকে সহজ ও সাশ্রয়ী করতে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং শুল্ক-সংক্রান্ত যৌক্তিক সংস্কার শুরু হবে। আপনারা ধৈর্য রাখুন। মৌলিক সংস্কারে সবাইকেই কিছুটা ছাড় দিতে হয় এবং সাময়িক টেনশন মোকাবিলা করতে হয়’ -যোগ করেন তৈয়্যব।
এনইআইআর বাস্তবায়নে আমদানীকারকদের সহযোগিতার পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে হ্যান্ডসেটের মূল্য আরো প্রতিযোগিতামূলক রাখতে স্থানীয় মোবাইল উৎপাদকদের প্রতিও আহ্বান জোনিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। তাদের উদ্যোশ্যে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, দেশের ভোক্তাদের স্বার্থে আপনারা যেন মোবাইলের মূল্য কমিয়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
একই সঙ্গে আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করছি যে— ব্যবসায়ীরা যেন অবৈধ আমদানি, চোরাচালানকৃত ফোনের বাজার বিস্তার, দেশীয়ভাবে চুরি হওয়া ফোনের ক্রয় বিক্রয় কিংবা ভুয়া IMEI দিয়ে ক্লোন মোবাইলের ব্যাবসা সম্প্রসারণ, কিংবা বিদেশের রিফার্বিশড/পুরোনো ফোনের কেসিং পরিবর্তন করে নতুন হিসেবে বাজারজাত করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন।
‘বাংলাদেশকে এভাবে আমরা মোবাইল ফোন চোরাচালানের কেন্দ্র এবং ইউজড ফোনের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত করতে পারি না। আমরা আশা করি, আমদানি শুল্ক ধীরে ধীরে যৌক্তিক মাত্রায় নামিয়ে আনতে পারলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই স্মার্টফোনের দাম অনেক কমে আসবে। দিনের শেষে, ডিজিটাল স্পেইসকে নিরাপদ রাখা, ডিভাইস কেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের হাতে সুলভে নিরাপদ ডিভাইস পৌঁছে দেওয়াই হচ্ছে আমাদের প্রধানতম লক্ষ্য’- যোগ করেন তিনি।
এরআগে গত ৫ নভেম্বর মোবাইলফোন আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর কমানোর অনুরোধ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। চিঠিতে সরকারের রাজস্ব রক্ষা, অবৈধ মোবাইলফোনের অনুপ্রবেশ রোধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টারের (এনইআইআর) চালু করতে মোবাইলফোন আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক ও ভ্যাট কমানো এবং বাজারে বিদ্যমান অননুমোদিত মোবাইলফোনকে বৈধকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়েছিলো কমিশন। অনানুষ্ঠানিক ভাবেই ‘বিষয়টি বিবেচনা করা হবে’ বলে জানিয়েছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। শুল্ক কমানো ছাড়াও বিটিআরসি ওই চিঠিতে তিনটি বিষয়ে এনবিআরের কাছে মতামতসহ সিদ্ধান্ত চেয়েছিলো। এগুলো হলো- স্বল্প ও যৌক্তিক সময় দিয়ে দেশের ভেতরে প্রবেশ করা অননুমোদিত মোবাইলফোন বিটিআরসির ডেটাবেজে সংযুক্ত করা হলে সে বিষয়ে প্রযোজ্য শুল্কায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত; দেশে উৎপাদিত স্মার্টফোন এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা মুঠোফোনের ক্ষেত্রে শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর আশু ব্যবস্থা। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং দেশে অভ্যন্তরে তৈরি মোবাইলফোনের শুল্কের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ওই বৈঠকে এই তিন বিষয়ে একটি বাজারবান্ধব সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, দেশে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ৬০ শতাংশের বেশি আনঅফিসিয়াল বা অননুমোদিত। তবে খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি—যা এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ‘গ্রে মার্কেট’ হিসেবে বিবেচিত। এ বিশাল বাজারের পেছনে মূল কারণ হলো করের ব্যাপক বৈষম্য। অনুমোদিত মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে মোট প্রায় ৫৭ শতাংশ কর দিতে হয়, আর স্থানীয় উৎপাদনে করের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর বিপরীতে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা কার্যত কোনো করই দেন না। ফলে তারা একই পণ্য প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করতে পারেন। তাই কম দামে ফোন কিনতে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই এ বাজারের দিকে ঝোঁকে। এমন বাস্তবতায় ২০১৬ সালে সারাদেশে বাধ্যতামূলক সিম নিবন্ধন কার্যকর হওয়ার পর থেকে হ্যান্ডসেট নিবন্ধন চালুর উদ্যোগ নিলেও দফায় দফায় সময় পিছিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার।
ডিবিটেক/মুইম/ওআর



