‘যকের ধন’-এর ‘যক’ কারা!
বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অলৌকিকতা, রূপকথা আর গুপ্তধনের নানা রোমাঞ্চকর উপকথা। শীতের আমেজ কিংবা ভূতচতুর্দশীর নিঝুম রাতে প্রদীপের আলোয় এমন অনেক গল্পই আমাদের শিহরিত করে তোলে। এর মধ্যে ‘যকের ধন’ কথাটি ছোট-বড় সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই যক বা যক্ষ আসলে কারা? পুরাণ আর লোককথার মারপ্যাঁচে যক্ষ […] The post ‘যকের ধন’-এর ‘যক’ কারা! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অলৌকিকতা, রূপকথা আর গুপ্তধনের নানা রোমাঞ্চকর উপকথা। শীতের আমেজ কিংবা ভূতচতুর্দশীর নিঝুম রাতে প্রদীপের আলোয় এমন অনেক গল্পই আমাদের শিহরিত করে তোলে। এর মধ্যে ‘যকের ধন’ কথাটি ছোট-বড় সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই যক বা যক্ষ আসলে কারা? পুরাণ আর লোককথার মারপ্যাঁচে যক্ষ আর ‘যক’-এর ধারণাটি সময়ের সঙ্গে বেশ কিছুটা পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে।
পৌরাণিক ও ধর্মীয় শাস্ত্রে যক্ষ হলো ধনসম্পদের দেবতা কুবেরের অনুচর এবং রক্ষক। এরা কোনো অভিশপ্ত বা সাধারণ মৃত মানুষ নয়, বরং এক ধরনের অর্ধদেবতা বা উপদেবতা। মহাভারত ও পুরাণে যক্ষদের সরব উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন মহাবিদ্যার সাধনা ও উপাসনার সঙ্গেও এদের সংযোগের কথা বলা হয়েছে। প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো, এই উপদেবতারা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অমূল্য ধনসম্পদ পাহারা দিয়ে রক্ষা করেন এবং সাধকদের সিদ্ধি লাভে সহায়তা করেন।
অন্যদিকে, বাংলা লোকসাহিত্যের ভূতগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি শ্রেণি হলো লোককথার এই ‘যক’। লোকমুখে প্রচলিত ভয়াল কাহিনী অনুযায়ী, প্রাচীনকালে গুপ্তধন পাহারা দেওয়ার জন্য নিষ্ঠুর উপায়ে জীবন্ত মানুষকে গুপ্তভাণ্ডারে আটকে রেখে খাদ্য ও জল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হতো। দিনের পর দিন অনাহারে মানুষটির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার আত্মাও সেই গুপ্তধনের প্রহরী বা ‘যক’-এ পরিণত হতো। সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই যক অনন্তকাল ধরে সম্পত্তি রক্ষা করে যেতো, যে পর্যন্ত না সেই বংশের বা নির্দিষ্ট রক্তধারার কেউ সেখানে আসত। অন্য কেউ সেই সম্পত্তি স্পর্শ করার সাহস করলেই যক তাদের প্রাণে মেরে ফেলত।
এই লোককথার পরিসর আরও বেশি লোমহর্ষক হয়ে উঠেছে প্রাচীনকালের ডাকাতদলকে কেন্দ্র করে। জনশ্রুতি আছে, অতীতে দুর্গম পথ দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে ডাকাতরা সদ্য বিবাহিত নববধূকে ধরে তাদের গোপন আস্তানায় নিয়ে আসত। মেয়েটির গায়ের সমস্ত গয়না কেড়ে নিয়ে তাকে অন্ধকার গুপ্তভাণ্ডারে বন্দি করে রাখা হতো। অল্প কিছুদিনেই অনাহারে বা নিদারুণ নির্যাতনে সেই নতুন বউটির মৃত্যু হলে সেও যকে পরিণত হতো। বিশ্বাস করা হতো যে, সদ্য বিবাহিত এই তরুণী বউদের আত্মা সাধারণ মৃতদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হতো, ফলে ডাকাত সর্দাররা তাদেরই প্রহরী বা যক হিসেবে বেছে নিত।
কালের পরিক্রমায় হেমেন্দ্রকুমার রায়ের মতো প্রথিতযশা লেখকদের হাত ধরে এই লোকজ বিশ্বাসগুলো বাংলা কিশোর সাহিত্য ও রোমাঞ্চকর উপন্যাসে দারুণভাবে স্থান পায়। ইতিহাসের মাপকাঠিতে বা প্রমাণের আলোয় এসব তথ্যের কোনো বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এগুলো মূলত গ্রামীণ সমাজ ও লোকসংস্কৃতির গর্ভে জন্ম নেওয়া কিছু গা ছমছমে কল্পনা। তবে ইতিহাসের সত্যতা যাই হোক না কেন, এই রোমাঞ্চকর আখ্যানগুলো আবহমানকাল ধরে বাংলার ভূতচতুর্দশী বা শীতের রাতের রোমাঞ্চকে আরও জমজমাট করে তুলেছে। রূপকথা আর লোকবিশ্বাসের এই সুতোয় গাঁথা যকের গল্পগুলো তাই আজও বাঙালি মানসে সমানভাবে রহস্যময় ও চিরন্তন আকর্ষণ হয়ে বেঁচে আছে।
The post ‘যকের ধন’-এর ‘যক’ কারা! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





