বিজয়ের দিনের প্রশ্ন: নাগরিকের ডেটা কার নিয়ন্ত্রণে?
১৬ ডিসেম্বর, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব আর বিজয়ের দিন। ভূখণ্ড, আর আত্মনিয়ন্ত্রণের পতাকা উড়ানোর দিন। কিন্তু রাষ্ট্র যখন ক্রমে ডিজিটাল রূপ নেয়, তখন সার্বভৌমত্বের ধারণাও বদলে যায়। আজ আর প্রশ্ন কেবল মানচিত্র বা পতাকা ঘিরে নয়—প্রশ্ন উঠছে নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয়, ব্যক্তিগত উপাত্ত ও তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি বছর পরে এসে, আজ এই বিজয়ের দিনে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসে: নাগরিকের ডেটা কার নিয়ন্ত্রণে?
ডিজিটাল রাষ্ট্রে নাগরিকের অস্তিত্ব ক্রমেই ডেটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল সংযোগ, ব্যাংক হিসাব, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুই উপাত্ত হিসেবে সংরক্ষিত, বিশ্লেষিত ও বিনিময়যোগ্য। এই বাস্তবতায় ডেটা আর নিছক প্রশাসনিক সম্পদ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যে রাষ্ট্র নাগরিকের ডেটা নিয়ন্ত্রণ করে, সে রাষ্ট্র কার্যত নাগরিকের জীবনপ্রবাহের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করে। এখানেই ‘ডেটা সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক গুরুত্ব পায়।
ডেটা সার্বভৌমত্ব বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়—কার আইন, কার নীতি ও কার নিয়ন্ত্রণে নাগরিকের ডেটা থাকবে। এটি শুধু ডেটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে সেই প্রশ্ন নয়; বরং কে সিদ্ধান্ত নেবে ডেটা কীভাবে সংগ্রহ হবে, কতদিন থাকবে, কার সঙ্গে শেয়ার হবে এবং প্রয়োজনে কে তা মুছে ফেলতে পারবে—এই সব প্রশ্নের সমষ্টি। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ডেটা সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রে থাকার কথা নাগরিকের সম্মতি ও অধিকার। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র নিজেকে ডেটার প্রাথমিক মালিক হিসেবে দেখতে শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগ, এমনকি কল রেকর্ড ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য অনিরাপদ থাকার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনা আলাদা আলাদা মনে হলেও একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে—রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় স্তরেই ডেটা ব্যবস্থাপনার জবাবদিহির ঘাটতি। সমস্যা শুধু ফাঁসের নয়; সমস্যা হলো নাগরিক জানেন না তার ডেটা কোথায় যাচ্ছে, কে ব্যবহার করছে এবং ভুল ব্যবহারের প্রতিকার কোথায়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রণীত দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সামনে আসে—ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ। কাগজে-কলমে এই আইনগুলো ডেটা সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের কথা বলে। ব্যক্তিগত উপাত্তের সম্মতিভিত্তিক সংগ্রহ, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—এসব নীতিগতভাবে ইতিবাচক। কিন্তু আইনের ভাষা ও কাঠামো বিশ্লেষণ করলে কিছু মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রথমত, এই আইনগুলোতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ব্যাখ্যা অত্যন্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘জনস্বার্থ’ বা ‘রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে’—এই ধরনের শব্দবন্ধ প্রয়োজনে যেকোনো নাগরিক সুরক্ষাকে অকার্যকর করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডেটা তদারকির জন্য যে কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, তার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কার্যকর ডেটা সুরক্ষার জন্য যে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজন—যারা রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের ওপর সমানভাবে নজরদারি করবে—সেই ভারসাম্য এখানে স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআর বা অন্যান্য ডেটা সুরক্ষা কাঠামোতে নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রকেও নাগরিকের ডেটা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে হয় এবং স্বাধীন আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের আইনি কাঠামো সেই মানদণ্ডে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ—সে প্রশ্ন এখনো উন্মুক্ত। বিশেষ করে ডেটা সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ন্যূনতমতা’ এবং ‘উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধতা’ বাস্তবে কতটা মানা হবে, তা আইন নয়, প্রয়োগই ঠিক করবে।
সম্ভাব্য অপপ্রয়োগের ঝুঁকিটিই এখানে সবচেয়ে বড়। শক্তিশালী ডেটা অবকাঠামো যেমন সেবার মান বাড়াতে পারে, তেমনি তা নজরদারি, প্রোফাইলিং ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারও হতে পারে। কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যদি দুর্বল আইনি সুরক্ষার মধ্যে থাকে, তবে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। ইতিহাস বলছে, যে ক্ষমতার অপব্যবহার সম্ভব, তা একসময় না একসময় ঘটেই।
রাষ্ট্র বনাম নাগরিক: ডেটা সার্বভৌমত্বের দার্শনিক দ্বন্দ্ব
রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ডেটা শাসনক্ষমতার একটি নতুন হাতিয়ার। পরিকল্পনা, সেবা ও নিরাপত্তার যুক্তিতে রাষ্ট্র আরও বেশি ডেটা চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাগরিকের দৃষ্টিতে একই ডেটা হয়ে উঠতে পারে ঝুঁকির উৎস। এই দ্বন্দ্বটি মূলত ক্ষমতার। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ডেটার মালিক হয়ে ওঠে, তবে নাগরিক রূপ নেয় পর্যবেক্ষণযোগ্য সত্তায়। আর নাগরিক যদি নিজ ডেটার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে তার স্বাধীনতা থাকে কাগজে, বাস্তবে নয়।
ডেটা সার্বভৌমত্ব তাই রাষ্ট্রের শক্তি বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার প্রশ্ন। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রের জন্য নয়, মানুষের জন্য। ডিজিটাল বাংলাদেশে সেই সার্বভৌমত্বের নতুন রূপ হলো নাগরিকের ডেটার উপর নাগরিকের অধিকার। প্রশ্নটি তাই অনিবার্য: আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ছি, যেখানে নাগরিক ডিজিটালভাবেও সুরক্ষিত—না কি এমন এক ব্যবস্থায় প্রবেশ করছি, যেখানে স্বাধীনতা ধীরে ধীরে একটি লগফাইলে পরিণত হচ্ছে?
লেখকঃ আশফাক সফল, আইটি প্রফেশনাল; যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস ফোরাম (বিডিসাফ)।







