রেহান আসিফ আসাদকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চর দিনের টোকিও সফর
২৯৫ মিলিয়ন ডলার ঋণে গতি পাবে হাই-টেক উৎপাদন ও বিনিয়োগ; স্বাক্ষরিত হলো ৬টি চুক্তি
- ‘ইএসডিপি’ চুক্তির অধীনে জাপানের শ্রমবাজারে আইসিটি ও কারিগরি গ্র্যাজুয়েটদের সরাসরি কর্মসংস্থান
- ১০ কোটি ডলারের প্রকল্পে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং ও টেলিকম অবকাঠামোতে জাপানি সরাসরি বিনিয়োগের দুয়ার উন্মুক্ত
- বিজ্ঞান ও আধুনিক ডেটা-ড্রাইভেন প্রযুক্তির সম্প্রসারণে যৌথভাবে কাজ করবে ঢাকা-টোকিও
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক টোকিও সফরে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ছয়টি ঐতিহাসিক নথি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সাথে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশ আধুনিকায়নে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার (৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েন) ঋণ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
সফরে দুই দেশের প্রধানদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের উদীয়মান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), সফটওয়্যার রপ্তানি, হাই-টেক উৎপাদন এবং টেলিকম অবকাঠামো খাতে। বিশেষ করে দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পায়নে এই সফর এক যুগান্তকারী দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে সস্ত্রীক টোকিও যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার আইসিটি, টেলিকম ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
২৮ অক্টোবর, বুধবার সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন জানান, সম্পাদিত চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিগুলোর মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্ব এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
জাপানের প্রযুক্তি বাজারে সরাসরি কর্মসংস্থান: ইএসডিপি চুক্তি
চারদিনের এই সফরে স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ খাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ‘স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (ইএসডিপি) সংক্রান্ত সহযোগিতা স্মারক। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি গ্র্যাজুয়েটদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড আর্কিটেকচার, ডেটা সায়েন্স, উন্নত প্রোগ্রামিং এবং আধুনিক টেলিকমিউনিকেশন প্রযুক্তিতে জাপানি শিল্পের মানদণ্ড অনুযায়ী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই কর্মসূচির অধীনে আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত আইটি পেশাদার ও দক্ষ কারিগরি প্রকৌশলীদের জন্য সরাসরি জাপানের মূল শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হবে। জাপানের তীব্র জনবল সংকট এবং বাংলাদেশের তারুণ্যনির্ভর মেধার মেলবন্ধনে এটি দেশের প্রযুক্তিভিত্তিক রেমিট্যান্স বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
হাই-টেক উৎপাদন ও টেলিকমে জাপানি বিনিয়োগের নতুন আবহ
ব্যবসা ও অর্থনৈতিক পরিবেশের মানোন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (মেটি/METI) এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি/ERD) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে একটি আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা স্মারক (MoC)। এর সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে জাপানের পক্ষ থেকে ১৫.৮৮ বিলিয়ন ইয়েন বা ১০ কোটি ৮ লাখ মার্কিন ডলারের ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ ঋণ প্রতিশ্রুতি।
সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদদের মতে, এই তহবিল বাংলাদেশের হাই-টেক পার্ক, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন হাব, টেলিকম ডাটা সেন্টার এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে জাপানি বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি বিনিয়োগকে (FDI) উৎসাহিত করবে। জটিল শুল্ক ও নীতিগত বাধা দূর করে একটি সমন্বিত ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জাপানি স্মার্ট ডিভাইস ও চিপ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের অ্যাসেম্বলি ও গবেষণা প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহী হবে।
বিজ্ঞান, আইওটি ও আধুনিকায়ন খাতে বিস্তৃত প্রভাব
টেলিকম ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় ঘোষিত ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের (৩০.৬৮ বিলিয়ন ইয়েন) ঋণ স্থানীয় স্তরে স্মার্ট প্রশাসনিক সংযোগ ও ডিজিটাল গভর্নেন্স জোরদারে কাজে লাগবে। পাশাপাশি জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের (MAFF) সাথে স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ড্রোন প্রযুক্তি এবং ডেটা-চালিত স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার ও জিনোমিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান নিশ্চিত হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা আসিফ রেহানের উপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশের ফ্রন্টলাইন ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। উপকূলীয় নজরদারিতে ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের জাহাজ অনুদান এবং পরিবেশগত অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরের পাশাপাশি এই সামগ্রিক সহযোগিতা চুক্তি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে একটি নির্ভরযোগ্য উদ্ভাবন ও উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এমপিএস/এফওই//





