শুক্রবার শেষ হচ্ছে ইউনিট-১  এর প্রস্তুতি; নভোথিয়েটার থেকে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

৭ এপ্রিল শুরু হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম

৭ এপ্রিল শুরু হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১৮:১৯  

আগামী ৭ এপ্রিল শুরু হবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম। ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে চুল্লিতে ইউরেনিয়াম রড লোড করা হবে। সূত্রমতে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ঈদের ছুটিতেও কার্যক্রম চালিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ২৭ মার্চ, শুক্রবারের মধ্যে শেষ হবে ইউনিট-১ এর সকল প্রস্তুতিমূলক কাজ। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকার নভোথিয়েটার থেকে ভর্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন সরকার প্রধান তারেক রহমান। এসময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকতে পারেন। এ ছাড়া প্রকল্প সাইটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক উপস্থিত থাকবেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনিং এবং জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে। জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের পর চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, আগামী ৭ এপ্রিল থেকে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে। আমরা আশা করছি, জুলাইয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়সূচি বজায় থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিটটি পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যাবে। 

অপরদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানান, জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়ায় রিয়্যাক্টরের কোরে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ জ্বালানি রড স্থাপন করা হয়, যা চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করে এবং সেই তাপ থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

তিনি জানান, প্রায় ২ হাজার পরীক্ষার মধ্যে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬৫০টি সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত শেষ করা হবে এবং বড় কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তদারকি করছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে প্রায় এক মাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে আরও দুই মাস সময় লাগতে পারে। ইউনিট-১ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। আর ইউনিট-২ এর কাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের অগ্রগতি এখন ৮১ শতাংশের বেশি। রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপনের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের মধ্যেও প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে শিল্প, কৃষি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্র স্থাপিত এলাকা সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান বলেন, স্থানীয় জনগণের বহুদিনের প্রত্যাশিত রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে যাচ্ছে শুনে আমি এবং আমার এলাকার জনগণ খুবই আনন্দিত। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি সময়োপযোগী ও গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি।

জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মন্ডল ওরফে লিচু কিতাব বলেন, রূপপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং করা হচ্ছে শুনে অত্যন্ত আনন্দ লাগছে। আমাদের দীর্ঘদিনের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প নিয়ে অনেক বিরূপ কথা শুনেছি যে, আণবিকের কারণে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। আসলে বাস্তবতা কী সেটা আমরা এবারে উপলব্ধি করতে পারব, পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিশাল অরণ্যের মধ্যে কৃষিতে কোনো ক্ষতির কারণ না- বরং কৃষি বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে শুধু বিদ্যুৎই আসবে না, এখান থেকে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাদের কৃষিকে আরও উন্নয়ন করতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।

ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খায়রুল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আলহাজ্ব খায়রুল ইসলাম বলেন, আমাদের অনেক অনেক আকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং হতে যাচ্ছে শুনে খুবই আনন্দিত। বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে হলে রূপপুর প্রকল্পে শুধু মাত্র ২,৪০০ মেগাওয়াট চালু করলেই হবে না। এখানে আরও ২,৪০০ মেগাওয়াট প্রকল্প নির্মাণের জায়গা রয়েছে। তাই রূপপুরে মোট ৪৮,০০ মেগাওয়াটের জন্য প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

প্রসঙ্গত, রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে এ কাজ চলছে। এর আগে ২০১৩ সালে সমীক্ষা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি হয়। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের প্রায় ৮১ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এতে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। শুরুতে ২০২২ সালে চালুর কথা থাকলেও তিন বছর বিলম্বিত হয়। পরে বাংলাদেশ ও রাশিয়া ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সময়সীমা বাড়ায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রোসাটম। রিঅ্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান পূরণে সক্ষম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং সেটিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ এখনও চলছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হতে পারে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। সে অনুযায়ী এ প্রকল্প থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম