বিনিয়োগ ও নীতিসহায়তা চায় ক্যাব
ছাদে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা ১৩২ মেগাওয়াট-পিক
- সমীক্ষায় চার ক্ষেত্রে ১৩২.২৮ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা চিহ্নিত
- বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেড়েছে ৬৯ শতাংশ পরিবারের; সরবরাহকে অনির্ভরযোগ্য বলেছে ৫৫ শতাংশ
- সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সুপারিশ
বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে ১৩২.২৮ মেগাওয়াট-পিক (MWp)। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর এলাকায় এ সম্ভাবনা চিহ্নিত করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির প্রস্তাব, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, কার্যকর নীতি ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২৮ অক্টোবর, বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত গণসংলাপে সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে ক্যাব। একই অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য কাজে লাগিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের সম্ভাবনা এবং লাইফলাইন গ্রাহকদের সহায়তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
চার ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা
ক্যাবের সমীক্ষায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা চারটি ক্ষেত্রে যাচাই করা হয়। এতে ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২.৫০ মেগাওয়াট-পিক, ১৫০টি কলেজে ৫১.১২ মেগাওয়াট-পিক, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪.৬০ মেগাওয়াট-পিক এবং শৈলকুপা পৌর এলাকায় ৪.০৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য সক্ষমতা ১৩২.২৮ মেগাওয়াট-পিক।
ক্যাবের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির স্বচ্ছতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বাংলাদেশে এর ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
স্ট্যামফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিহাব উদ্দিন বলেন, সমীক্ষাটি বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সৌর প্যানেল স্থাপন ও এনার্জি অডিট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিল ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৩৪টি এবং শৈলকুপা পৌর এলাকার ২২২টি—মোট ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৮৯ শতাংশ পরিবার মনে করে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে তাদের জীবনমান উন্নত হয়েছে। তবে ৬৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেড়েছে। অন্যদিকে, ৫৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলে উল্লেখ করেছে।
গত এক দশকে ৮৫ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে এবং ৭৭ শতাংশ পরিবারের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে ফ্রিজের মালিকানা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ এবং টেলিভিশনের মালিকানা ৩৪ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুতের কারণে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। রাতে বিদ্যুতের কারণে বেশি নিরাপদ বোধ করেন বলে জানিয়েছেন ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা।
এই তথ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের সামাজিক সুফল তুলে ধরলেও বিদ্যুতের সাশ্রয়ী মূল্য ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। ক্যাবের সুপারিশ অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের সহায়তার পরিমাণ ও বিতরণপদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের প্রস্তাব
পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যকে দারিদ্র্য শনাক্তকরণের প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, নিয়মিত মিটার রিডিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার চিহ্নিত করা গেলে পরবর্তী পর্যায়ে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
ক্যাবের প্রস্তাবে রয়েছে—পরীক্ষামূলকভাবে পদ্ধতি চালু, দায়িত্ব ও সমন্বয় নির্ধারণ, মিটার ও প্রকৃত পরিবারের সম্পর্ক যাচাই, ধারাবাহিক ১২ মাসের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় তথ্য দিয়ে ব্যবহারের সীমা যাচাই এবং প্রতিনিধিত্বশীল এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা। পাশাপাশি স্বাধীন তুলনামান প্রতিষ্ঠা ও পদ্ধতিটির গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড আগেই নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে কোনো পরিবারের দারিদ্র্য নির্ধারণ করা যাবে না বলে সতর্ক করেছেন বক্তারা। প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আবার অনেক দরিদ্র পরিবার ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তাই কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকে দারিদ্র্যের চূড়ান্ত প্রমাণ না ধরে সরেজমিন যাচাইসহ অন্যান্য আর্থসামাজিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
ক্যাবের হিসাবে, এ পদ্ধতি কার্যকর হলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১৬ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে যাচাই করতে পদ্ধতিটির নির্ভুলতা, অন্তর্ভুক্তি ও কার্যকারিতা পরীক্ষামূলকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জবাবদিহি ও কার্যকর নীতির দাবি
গণসংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অনিয়মের সুযোগ কমবে। গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি খাত ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত। দারিদ্র্য নিরূপণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে নতুন ধারণা ও প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি; কোনো পরিসংখ্যানকে যাচাই-বাছাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ ও সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষক ও সাংবাদিক কাজল রশীদ শাহীন বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণের প্রস্তাবটি সময়োপযোগী হলেও এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিবার যেন ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গবেষক আনিস রায়হানও বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন।
ক্যাবের তিন সুপারিশ
গণসংলাপে ক্যাব তিনটি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলো হলো—সরকারের ব্যয়বহুল প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকে দারিদ্র্য শনাক্তকরণের প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ; স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ; এবং লাইফলাইন গ্রাহকদের সহায়তার পরিমাণ ও বিতরণপদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। অনুষ্ঠানে সরকার, নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, শিক্ষা ও সাংবাদিকতা খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ক্যাব।
//ডিবিটেক/জেএনআর/এমপিএস/এফওই//





