বুয়েটে তিন দিনের আয়োজন

বুয়েটে শুরু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসব

  • দেশীয় সম্পদভিত্তিক ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্ব
  • উদ্ভাবন মেলায় ২০, প্রযুক্তি মেলায় ৯ স্টল
  • তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সিড ফান্ডিংয়ের সুযোগ

বুয়েটে শুরু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসব
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৫৬  

দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির প্রসার এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় মাঠে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’। উৎসবের মাধ্যমে নীতিনির্ধারক, গবেষক, বিনিয়োগকারী, তরুণ উদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্ভাবন থেকে বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত কার্যকর সহযোগিতার পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি) যৌথভাবে এ আয়োজন করছে। ‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত উৎসবে তরুণ, নারী, শ্রমিক, নাগরিক সংগঠন ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা এক হাজারের বেশি প্রতিনিধির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বুয়েটের কেন্দ্রীয় মাঠ পর্যন্ত সচেতনতামূলক র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের তথ্যমতে, এতে প্রায় ২০০ অংশগ্রহণকারী যুক্ত হন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পরে সূর্যোদয় ইয়ুথ সোসাইটির উদ্যোগে ৩০ জন পারফরমারের অংশগ্রহণে একটি ফ্ল্যাশমব পরিবেশিত হয়।

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির পথে

সংবাদ সম্মেলনে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উদ্ভাবন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষক, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তরের পরিকল্পনা, আলোচনা ও বাজেট প্রণয়ন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বুয়েটের আইইএসডির পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএএ শওকত চৌধুরী বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সভ্যতার উন্নয়ন ও সম্পদের মূল্যায়নে জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলেও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন টিমের ম্যানেজার ও জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, উৎসব থেকে ন্যায়ভিত্তিক নীতি ও বিনিয়োগের কর্মসূচি তৈরির প্রত্যাশা রয়েছে। উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি এবং আয়োজন-পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে এ প্ল্যাটফর্ম ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

হিথিউম এনার্জি স্টোরেজ টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান সৌরশক্তির যন্ত্রাংশের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন ফারাহ্ কবির। এতে আরও বক্তব্য দেন দ্য আর্থ সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক আনওয়ার হোসেন এবং কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ও জেটনেট-বিডির ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক সানজিদা সুলতানা।

উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও সিড ফান্ডিং

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) উৎসবের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা রয়েছে। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের ফার্স্ট কাউন্সিলর ও গ্রিন ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর ইনভেস্টমেন্টসের সেকশন হেড টবিয়াস বিয়ারম্যান, বাংলাদেশে অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট) জ্যাকব ডি লিওন এবং ফারাহ্ কবিরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে।

উৎসবে দেশীয় উদ্ভাবক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক প্রযুক্তি ও সেবা তুলে ধরতে দুটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ‘উদ্ভাবন মেলা’য় ২০টি এবং ‘প্রযুক্তি মেলা’য় নয়টি স্টল থাকবে। পাশাপাশি ‘ইনোভেশন-টু-ইমপ্যাক্ট মার্কেটপ্লেস’-এর মাধ্যমে স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকের সামনে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনগুলো সিড ফান্ডিং পাওয়ার সুযোগ পাবে।

শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উপায় নিয়ে অক্সফাম বাংলাদেশ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ বিষয়ে সংলাপ আয়োজন করবে। এ ছাড়া জ্বালানি নীতি ও সুশাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো এবং জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ ও প্লেনারি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

তরুণ ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ

গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের উৎসবেও ‘ইয়ুথ অ্যান্ড পিপল হাব’ অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে। সংলাপ, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, নেটওয়ার্কিং ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে নাগরিক, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে এ হাব। আয়োজকদের লক্ষ্য, এই অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো।

উৎসবের শেষ দিনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন ও স্রেডার পরিচালক প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান এবং বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেনও আয়োজনে থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।

সমাপনী আয়োজনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অবদান রাখা উদ্ভাবক, তরুণ নেতৃত্ব ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হবে। পুতুলনাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

আয়োজনটির সহ-আয়োজকদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর), গ্রিনারি এনার্জি সল্যুশন লিমিটেড, আইইইএফএ, অক্সফাম ইন বাংলাদেশ এবং দ্য আর্থ সোসাইটি।

সরকারি নীতিনির্ধারক, গবেষক, বেসরকারি খাত, বিনিয়োগকারী, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের একত্র করে জ্বালানি রূপান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করাই তিন দিনের এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

//ডিবিটেক/রিপোর্টার/সহ-সম্পাদক//