বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে অফলাইনে সরকারি ওয়েবসাইট

  • পিএইচপির দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটিতে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে পড়েছে
  • নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সতর্কতামূলকভাবে ওয়েবসাইট অফলাইনে নিয়েছে
  • নিরাপত্তা প্যাচ প্রকাশের পরপরই পিএইচপি হালনাগাদ করার আহ্বান জানিয়েছে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে অফলাইনে সরকারি ওয়েবসাইট
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৪৯  

বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা ঝুঁকিতে পড়েছে। সম্ভাব্য সাইবার হামলা ঠেকাতে নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে নিজেদের ওয়েবসাইট অফলাইনে নিয়েছে। নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকারদের হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ওয়েবসাইট পরিচালকেরা দ্রুত নিজেদের ব্যবস্থা সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছেন।

পিএইচপির নির্মাতারা মঙ্গলবার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করার কথা জানান। একই সঙ্গে সমাধান প্রকাশের পরপরই ব্যবহারকারীদের সফটওয়্যার হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তাঁরা। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে তাঁরা জানান, ত্রুটি সংশোধন করা নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে নতুন সংস্করণ প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। ইন্টারনেটের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট পিএইচপির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিরাপত্তা ত্রুটিটি ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ওয়েবের বড় অংশ পিএইচপিনির্ভর

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হান্টরেস এক ব্লগ পোস্টে জানায়, পিএইচপি ইন্টারনেটের সর্বত্র ব্যবহৃত হয়। ওয়ার্ডপ্রেস, ড্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টোর মতো প্ল্যাটফর্মের ওয়েবসাইট চালানোর পাশাপাশি শেয়ার্ড হোস্টিং ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ প্যানেল এবং এমন অনেক সফটওয়্যার সচল রাখতে এটি ব্যবহৃত হয়, যেগুলো নিজেদের পরিচয়ে পিএইচপির কথা উল্লেখ করে না।

ওয়েব ও ক্লাউড নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেইন নেখট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রাথমিক হামলা শুরু হয়েছে। নতুন আক্রমণপদ্ধতির সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধব্যবস্থা হালনাগাদ করা হচ্ছে।

সাময়িক সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে ক্লাউডফ্লেয়ার তাদের ফায়ারওয়ালের নিয়ম হালনাগাদ করছে। তবে নেখট সতর্ক করে জানান, এটি কেবল অস্থায়ী ব্যবস্থা। পিএইচপির নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রয়োগ করতে হবে।

স্বয়ংক্রিয় আপডেটে সমাধান নাও আসতে পারে

ওয়ার্ডপ্রেসের নিরাপত্তা প্লাগইন ওয়ার্ডফেন্স জানিয়েছে, ওয়ার্ডপ্রেসের সব ওয়েবসাইট পিএইচপি-চালিত সার্ভারে চলে। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, ওয়ার্ডপ্রেসের স্বয়ংক্রিয় হালনাগাদ ব্যবস্থার মাধ্যমে পিএইচপির এই নিরাপত্তা সমাধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগ হবে না।

তাই ওয়েবসাইটের মালিকদের পিএইচপি হালনাগাদের দায়িত্ব কার, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সার্ভার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, হোস্টিং সরবরাহকারী অথবা নিজস্ব কারিগরি দলের মাধ্যমে হালনাগাদ সম্পন্ন করতে হবে কি না, তা জানা জরুরি।

ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পিএইচপি ব্যবহারকারীদের অবিলম্বে সফটওয়্যার হালনাগাদ অথবা নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। সমাধান প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে ওয়েবসাইট অফলাইনে রাখারও পরামর্শ দিয়েছে তারা।

ডাচ সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাটি নিজেই সাময়িকভাবে অফলাইনে চলে যায়। সংস্থাটি জানায়, নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পিএইচপির বিস্তৃত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিএইচপি ৫ এবং এর পরবর্তী সংস্করণগুলো প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন কোন সংস্করণ ঝুঁকিতে রয়েছে, তা পিএইচপি কর্তৃপক্ষ তখনও প্রকাশ করেনি।

পিএইচপি একটি সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইটের কনটেন্ট তৈরি ও সরবরাহে ব্যবহৃত হয়। কোনো দর্শক ওয়েবপেজ খুললে পিএইচপি চালানো সার্ভার প্রয়োজনীয় কনটেন্ট প্রস্তুত করে ব্রাউজারে পাঠায়। এটি বিনামূল্যের উন্মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার, যা স্বেচ্ছাসেবকেরা রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

ওয়েব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকসের তথ্য অনুযায়ী, যেসব ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, সেগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ পিএইচপিতে চলে।

অন্যদিকে, ব্লগ ও ছোট ব্যবসার ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে সরকারি পোর্টাল, অনলাইন দোকান ও সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট—ইন্টারনেটের প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিও পিএইচপি।

ওয়ার্ডপ্রেস ডটকমের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অটোম্যাটিক জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা সমস্যার বিস্তারিত বিষয়ে মন্তব্য করে না। তবে তাদের দল প্রস্তুত রয়েছে এবং হালনাগাদ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে পিএইচপির নিরাপত্তা দলের সঙ্গে কাজ করছে।

পিএইচপি-নির্ভর ওয়েবসাইটের ব্যাপক বিস্তারের কারণে এই ঘটনার প্রভাব শুধু সরকারি পোর্টালে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। ওয়েবসাইট পরিচালকদের জন্য দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ, সার্ভারের সংস্করণ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।

//ডিবিটেক/আইএনএম/এসএমই/এমভিএনও//