দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী বার্তা
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো নিজের রাজনৈতিক দল বা বলয়ের কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে না রাখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছে। ঢাকার স্বনামধন্য বেসরকারি একটি চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠান দখল, ভাঙচুর ও লুণ্ঠনের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগের পর মিষ্টিকে দ্রুত পদত্যাগে […] The post দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী বার্তা first appeared on Sarabangla | Brea

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো নিজের রাজনৈতিক দল বা বলয়ের কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে না রাখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছে।
ঢাকার স্বনামধন্য বেসরকারি একটি চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠান দখল, ভাঙচুর ও লুণ্ঠনের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগের পর মিষ্টিকে দ্রুত পদত্যাগে বাধ্য করার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতিতে এটি জবাবদিহির একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
এই সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনআস্থায় সাময়িক ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও এর মধ্য দিয়ে আরও বড় একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে। বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দুর্নীতির মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত একটি সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান, তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আইনের শাসন সবার জন্য সমান। দেশের স্বার্থ যেকোনো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে, সেটিও তাকে কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে হবে।
‘আই হ্যাভ এ প্লান’ এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এই দুই অঙ্গীকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ায় জন-প্রত্যাশা ছিল বিপুল। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তার সরকারকে যে শক্তিশালী ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার পেছনে ছিল কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু নির্বাচনের পর কয়েক মাসের বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশা ফিকে হয়ে হতাশাও বাড়ছে। দুর্নীতি, ঘুষ, অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি, ভাংচুর এবং গুরুতর অপরাধের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। উদ্বেগের বিষয়, এসব অভিযোগের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জড়িত। ফলে শুধু সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি ও অপশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বদলায়নি, এমন আশঙ্কা জনমনে জায়গা করে নিচ্ছে।
দেশে ঘুস-দুর্নীতির বিস্তার নিয়ে খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশে ঘুসের বিস্তার নিয়ে অকপটে বলেছেন, ‘কিছুই বদলায়নি।’ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার এমন সরাসরি মন্তব্য পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে। দুর্নীতির ভাইরাস যে এখনও রাষ্ট্র ও সমাজের গভীরে প্রোথিত, এটি তারই এক নির্মোহ স্বীকারোক্তি।
এমন প্রেক্ষাপটেই সংসদ সদস্য মিষ্টির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান জনমনে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা যখন প্রশ্নের মুখে, তখন এই পদক্ষেপ জনআস্থা ধরে রাখার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপকে সময়োপযোগী ও যথাযথ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সতর্কবার্তা। একটি পদত্যাগের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক জনরোষ প্রশমনের কৌশল হিসেবে দেখলে চলবে না। তা হলে এটি রাজনৈতিক প্রদর্শনীর বেশি কিছু হবে না। বরং এই ঘটনাকে ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী একটি ব্যাপক ও আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়ার সূচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের ইতিহাসও আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামোসহ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা যে সম্পদের, তার একটি বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় বা আত্মসাৎ হয়েছে। প্রায় প্রতিটি সরকারই জোরালো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি।
এর মূল কারণটিও খুব স্পষ্ট। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রতিষেধকের মধ্যেই যদি দুর্নীতির ভাইরাস বাসা বাঁধে, তাহলে সেই প্রতিষেধক কখনও কার্যকর হতে পারে না। অতীতে দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠদের আর্থিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ অনেক সময় উপেক্ষিত হয়েছে। অতীতের বিএনপি সরকারগুলোও এই রাজনৈতিক পক্ষপাতের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত ছিল না। দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি সত্যিই এই দুষ্টচক্র ভাঙতে চান, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাকে একটি সত্যিকারের, নিরপেক্ষ ও সর্বাত্মক লড়াই শুরু করতে হবে। এই লড়াইয়ে দলীয় পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবদান কিংবা ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা কোনো বিবেচ্য হতে পারে না। দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখানোর মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর হাতে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়পত্র থাকলে তা কোনোভাবেই তাকে দায়মুক্তি দিতে পারে না।
দলীয় পরিচয় যদি কাউকে আইনের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই অপরাধের সহযোগীতে পরিণত হয়। মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বার্তা গেছে যে, দলীয় আনুগত্য অপরাধের দায় থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেবে না। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দৃষ্টান্তকে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত করা।
এ জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রকৃত স্বাধীনতা ও কার্যকর সক্ষমতা দিতে হবে। আর্থিক অপরাধ, দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য গুরুতর অনিয়মের তদন্ত ও বিচারে তাদের নির্বাহী অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল থাকা চলবে না। একজন দুর্নীতিবাজকে সরাতে যদি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়। প্রকৃত সংস্কার তখনই হবে, যখন কোনো ব্যক্তির পদ, দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা না করে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে শনাক্ত, তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে পারবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের দেওয়া বিপুল ম্যান্ডেট কোনো দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের লাইসেন্স নয়। এটি ছিল আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনগণের সুস্পষ্ট দাবি। মানুষ একধরনের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পরিবর্তে আরেকটি গোষ্ঠীকে একই সুবিধা দেওয়ার জন্য ভোট দেয়নি। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে রাজনৈতিক ও দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার বদলে যোগ্যতা মূল্য পাবে এবং নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চাইলে পূর্বসূরিদের পরিচিত পথেই হাঁটতে পারেন, দলীয় ঐক্যের অজুহাতে নিজের দলের অনিয়মকারীদের রক্ষা করতে পারেন এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয়ে যেতে দিতে পারেন। আবার তিনি একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কের সাহসী পথও বেছে নিতে পারেন।
নিজ দলের দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিলে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অর্জন করতে পারেন জনগণের দীর্ঘস্থায়ী আস্থা। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ তাই কোনো সাময়িক রাজনৈতিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়। বরং এটিকে হতে হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সূচনা।
জনগণ তার ম্যান্ডেট দিয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সতর্কবার্তা এসেছে, আর এখন জনগণ সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে। প্রধানমন্ত্রীকে এখন প্রমাণ করতে হবে, বাংলাদেশ কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির চেয়ে বড়। বাংলাদেশ অবশ্যই বিএনপির চেয়েও বড়, এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে।
The post দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী বার্তা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





