৭ থেকে ১২ বছর বয়সেই বেশি নিপীড়ন, প্রথমে জোরপূর্বক পরে ভয় দেখানো
আওয়াজে উঠে এলো ৬০ শিশুর নিপীড়নের অভিজ্ঞতা
- প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৪৫, পরে প্রায় ৬০ অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে
- ৭ থেকে ১২ বছর বয়সে নিপীড়নের ঘটনা বেশি।
- বেনামী তথ্যের মাধ্যমে শিশু নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরছে প্ল্যাটফর্মটি
ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার: শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশের নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ ডট বিডি’ (awaz.bd) চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৬০টি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। এসব ঘটনার বড় অংশে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাঁদের ৭ থেকে ১২ বছর বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে।
৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে চালু হওয়া প্ল্যাটফর্মটিতে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ জন তাঁদের শিশুবেলার অভিজ্ঞতা বেনামে তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে সেই সংখ্যা প্রায় ৬০-এ পৌঁছায়।
প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, অনেক ঘটনায় প্রথমে জোরপূর্বক নিপীড়ন করা হয়েছে। পরে ভয় দেখিয়ে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তা অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যের বিশ্লেষণে ৬৩ শতাংশ ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। ৩৮ শতাংশ জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আনাই ‘আওয়াজ ডট বিডি’র লক্ষ্য ছিল। তবে প্ল্যাটফর্ম চালুর পর মেয়েরাও তাঁদের শৈশবে যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
বেনামী তথ্যেই তৈরি হচ্ছে চিত্র
আওয়াজ ডট বিডি-এর মূল বার্তা—‘আওয়াজ উঠাও’। প্ল্যাটফর্মটিতে বলা হয়েছে, মানুষের দেওয়া বেনামী তথ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, শিশু যৌন নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্ল্যাটফর্মটির দাবি, এখানে কোনো নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। ব্যবহারকারীদের তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না এবং কুকি বা অনলাইন ট্র্যাকিংও করা হয় না। সাইটটি নিজেই জানিয়েছে, এটি কোনো হেল্প সেন্টার বা আইনি সহায়তা কেন্দ্র নয়; এটি একটি বেনামী সচেতনতা ও তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম।
পরিবার ও পরিচিতজনের ভূমিকাও সামনে
প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক শিশুই পরিচিত ব্যক্তি, বিশ্বস্ত পরিচিত বা আত্মীয়ের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিচিত, ২৬ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৬ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ১০ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেয়েদের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ ঘটনায় পরিচিত, ১৪ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ৪৩ শতাংশ ঘটনায় দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের একজন পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। মোট ঘটনার ৫৬ শতাংশ ঘটেছে বাড়িতে। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ নিজের বাড়িতে, ১৯ শতাংশ অভিযুক্তের বাড়িতে এবং ১৫ শতাংশ নিজ আত্মীয়ের বাড়িতে ঘটেছে।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা
প্ল্যাটফর্মে এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, রাতে মাদরাসায় যাওয়ার পথে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এক আত্মীয়ের বন্ধুর কাছে আশ্রয় নেন। ওই ব্যক্তি তাঁকে একই কক্ষে থাকতে দেন। রাতে ঘুমের মধ্যে ওই ব্যক্তি তাঁকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেন। ভয়ে চুপ হয়ে গেলেও পরে চিৎকার করলে তিনি সরে যান।
অন্য এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, শৈশবে তাঁর এক নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে দীর্ঘদিন যৌন হয়রানিমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। প্রথমদিকে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে ঘটনাটি গুরুতর পর্যায়ে যায়। ওই অভিজ্ঞতার পর বন্ধুর পরামর্শে তাঁকে গর্ভধারণ-সংক্রান্ত চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগীরা শিশুদের নিরাপত্তা, পরিবারে সচেতনতা এবং পরিচিতজনের সঙ্গে শিশুদের মেলামেশার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নজর
প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তাদের একজন রাকিবুল হাসান (২৭)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। অন্য উদ্যোক্তা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর (৪২) কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, ছেলেশিশু ধর্ষণ, বিশেষ করে মাদরাসায় শিশু নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসার পর তাঁরা এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। তাঁদের লক্ষ্য, সরকার ও মাদরাসা বোর্ডগুলোকে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সক্রিয় করতে সামাজিক চাপ তৈরি করা।
তবে প্ল্যাটফর্ম চালুর পর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। শুরুতে শুধু মাদরাসায় ছেলেশিশু নিপীড়নের ঘটনা তুলে ধরার পরিকল্পনা থাকলেও পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নারী ও পুরুষ ভুক্তভোগীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা জানাতে শুরু করেন।
আওয়াজ.bd-এর বর্তমান সাইটেও ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্ক, ঘটনার পুনরাবৃত্তি, ভুক্তভোগীর বয়স, ঘটনার স্থান এবং লিঙ্গভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের কাঠামো রাখা হয়েছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এসব তথ্য নতুন করে সামনে এনেছে।
জরুরি প্রয়োজনে ১০৯৮ শিশু হেল্পলাইন, ১০৯ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন এবং ৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবাতে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।
//ডিবিটেক/এনটিও/ এসএমই/এমআইএসটি//





