মেনজিস এভিয়েশনসহ চার বৈশ্বিক জায়ান্টের লড়াই; ভাঙছে বিমানের একক আধিপত্য
তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা: বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব
- যাত্রীসেবা ও টার্নঅ্যারাউন্ড গতি বাড়াতে শর্টলিস্টেড হয়েছে মেনজিস, সুইসপোর্ট, চেলেবি ও ডিনাটা
- ১২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, ১,০০০ প্রত্যক্ষ চাকরি ও এভিয়েশন ট্রেনিং একাডেমির প্রস্তাব মেনজিসের
- ৬৫ দেশে ৩৫০ বিমানবন্দরে পরিচালিত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি আলোচনায় তুরস্কের চেলেবি
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এইচএসআইএ) নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এভিয়েশন সার্ভিস জায়ান্টগুলো। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে সেবার মান বৃদ্ধি, দ্রুততম সময়ে ব্যাগেজ খালাস এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘মেনজিস এভিয়েশন’ (Menzies Aviation) বড় অঙ্কের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের বিস্তারিত প্রস্তাব নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে সামনে এসেছে।
তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত জাপানি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে চারটি বৈশ্বিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত (শর্টলিস্ট) করা হয়েছে। এগুলো হলো—যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিনাটা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) নিরাপত্তা ও বিধিবদ্ধ সক্ষমতা মূল্যায়নের পরই চূড়ান্ত অপারেটর নির্বাচিত হবে।
বৈশ্বিক সক্ষমতার দিক থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি মেনজিস এভিয়েশন বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের ৬৫টি দেশের প্রায় ৩৫০টি বিমানবন্দরে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার। ২০২৫ সালে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রাজস্ব আয় করা এই প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, উন্নত সুরক্ষা মানদণ্ড এবং আধুনিক গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট (জিএসই) ঢাকার মাটিতে দ্রুত সেবা চালুর ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে তুরস্কের অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান চেলেবি ৫টি দেশের ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে প্রায় ৯ হাজার কর্মী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সামগ্রিক ভৌগোলিক পরিধি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতায় মেনজিস তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেলে মেনজিস দেশটিতে ১২ মিলিয়ন ডলারেরও (প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা) বেশি প্রাথমিক বিনিয়োগের রূপরেখা দিয়েছে। এ তহবিল দিয়ে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, র্যাম্প সার্ভিস, বিমান টার্নঅ্যারাউন্ড ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও আধুনিক গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হবে। মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস-প্রেসিডেন্ট চার্লস উইলি জানান, প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় জনবলকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১ হাজারেরও বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে; যার ৯৯ শতাংশই নেওয়া হবে বাংলাদেশ থেকে। পাশাপাশি পরিবহন ও সহযোগী শিল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পরোক্ষ কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে গড়ে তুলতে এবং বিদেশি কারিগরি নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক ‘এভিয়েশন ট্রেনিং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
উল্লেখ্য, বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার অনেক আগেই ২০১৮ সালে সিএএবি কর্তৃক আন্তর্জাতিক লাইসেন্স আহ্বানের সময় মেনজিস একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পূর্ণ বিধিসম্মত আবেদনপত্র, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ম্যানুয়াল জমা দিয়েছিল। ইতিমধ্যে ‘মেনজিস বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে প্রস্তুতি এগিয়ে রেখেছে তারা; সিএএবির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলে মাত্র তিন মাসের মধ্যে টার্মিনালে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
শাহজালাল বিমানবন্দরে দীর্ঘদিনের ব্যাগেজ বিলম্ব, টার্নঅ্যারাউন্ডের ধীরগতি এবং ভঙ্গুর সেবার প্রেক্ষাপটে এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা যাত্রীসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ছাপিয়ে সুনির্দিষ্ট ডেলিভারি সময়সীমা, দক্ষ বিমান পরিচালনা এবং স্থায়ী প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিশ্চিত করাই এই মেগা প্রকল্পের সফলতার মূল চাবিকাঠি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।
//ডিবিটেক/এসএসএসসি/এসএমই/এফওইডি//





