টেলিকম থেকে এআই প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের লক্ষ্য

জিওর আইপিওতে আকাশ আম্বানির নেতৃত্বের পরীক্ষা

  • জিওর ৩.২ বিলিয়ন ডলারের আইপিওতে দরপ্রস্তাব ছাড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলার
  • ৫৩৩ মিলিয়ন গ্রাহকের জিওকে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে চান আকাশ
  • মেটা ও গুগলসহ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তার

জিওর আইপিওতে আকাশ আম্বানির নেতৃত্বের পরীক্ষা
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৫৬  

ভারতের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মসের শেয়ারবাজারে প্রবেশকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মুকেশ আম্বানির বড় ছেলে আকাশ আম্বানি। প্রতিষ্ঠানটির ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) ২৩ অক্টোবর শুক্রবার পর্যন্ত দরপ্রস্তাব ৭৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল বিনিয়োগকারী আগ্রহের মধ্যেই রিলায়েন্স সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং জিওর প্রযুক্তিগত রূপান্তরে আকাশের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন এবং আইপিওর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ভারতের শেয়ারবাজারে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দরপ্রস্তাব পাওয়া আইপিওতে পরিণত হয়েছে।

উত্তরসূরি হিসেবে ক্রমেই দৃশ্যমান আকাশ

৩৫ বছর বয়সী আকাশ আম্বানি জিও প্ল্যাটফর্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি ২০২২ সাল থেকে রিলায়েন্স জিও ইনফোকমের চেয়ারম্যান। বিশ্লেষকদের কাছে এই দায়িত্ব বণ্টন মুকেশ আম্বানির উত্তরসূরি তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

জিওর আইপিও উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আকাশ নিজেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা, ৫৩৩ মিলিয়ন গ্রাহক এবং মুনাফার হার তুলে ধরেন। তাঁর যমজ বোন ইশা আম্বানিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তবে বাবা মুকেশ আম্বানি সেখানে ছিলেন না।

অনুষ্ঠানে আকাশ বলেন, “আমি এখানে পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হয়েছি।”

তাঁর সঙ্গে কাজ করা শিল্প খাতের নির্বাহীরা তাঁকে সহজে যোগাযোগ করা যায় এমন এবং প্রযুক্তি বিষয়ে সরাসরি যুক্ত একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আকাশ বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখলেও দৈনন্দিন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে অযথা হস্তক্ষেপ করেন না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

একজন নির্বাহী রয়টার্সকে বলেন, “মার্ক জাকারবার্গকে ফোন করেন তিনিই।” মেটা জিওর অন্যতম বড় শেয়ারধারী; প্রতিষ্ঠানটিতে তাদের অংশীদারত্ব প্রায় ১০ শতাংশ।

২০২০ সালে মেটা, গুগল ও অন্যান্য বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী জিওতে ১ দশমিক ৫২ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছিল, তখন যার মূল্য ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। রয়টার্সের সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানি ও তাঁর ছেলে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাদা আলাদা সম্পর্ক দেখভাল করেন। মুকেশের যোগাযোগ বেশি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর সঙ্গে; আর আকাশকে রিলায়েন্সের ‘সিলিকন ভ্যালি’মুখী প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি রিলায়েন্স ও মেটা।

টেলিকম থেকে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম

২০১৬ সালে বিনা মূল্যে ভয়েস কল ও ডেটা সেবা দিয়ে ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে বড় পরিবর্তন এনেছিল জিও। বর্তমানে একক দেশের গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে চীনের চায়না মোবাইলের পরেই জিওর অবস্থান। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যা ৫০ কোটির বেশি।

তবে জিওর আয়ের বড় অংশ এখনও প্রচলিত টেলিযোগাযোগ ব্যবসা থেকে আসে। রয়টার্সের হিসাবে, ১৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং মুনাফার প্রায় ৯৪ শতাংশ আসে টেলিকম ব্যবসা থেকে।

আকাশ ও জিওর লক্ষ্য হলো এই পরিচিতির বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সংযোগনির্ভর বিস্তৃত প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা। জিওর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ফোরজি ও ফাইভজির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যাপ, ডিজিটাল সেবা এবং ঘরোয়া প্রযুক্তিপণ্যের বিস্তার রয়েছে।

আইপিওর প্রসপেক্টাসে প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতির প্রথম বাক্য, “আমরা একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম।” প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতী এয়ারটেল ও ভোডাফোন আইডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আকাশ সম্প্রতি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকাকে বলেন, “জিও শুধু একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠান নয়।” তাঁর বক্তব্য, সংযোগসেবার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই জিওকে দেখা উচিত।

১২টি ভারতীয় ভাষায় এআই সেবা

জিওর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অংশ হলো গ্রাহকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কলের সারসংক্ষেপ এবং কথোপকথনের লিখিত প্রতিলিপি তৈরির সুবিধা চালু করা। আকাশ জানিয়েছেন, এ সেবা ১২টি ভারতীয় ভাষায় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আইপিও অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এটি করতে পারে এমন একমাত্র প্রতিষ্ঠান আমরাই।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের জিও গ্রাহকদের সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই গভীর ধারণা রয়েছে।”

এই পরিকল্পনা ইঙ্গিত দেয়, জিও শুধু মোবাইল সংযোগ বিক্রি নয়, বরং বিপুল গ্রাহকভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে এআইসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা থেকে আয় বাড়াতে চায়। তবে নতুন সেবাগুলোর বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ভর করবে গ্রাহকের ব্যবহার, মূল্য নির্ধারণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ওপর।

ভারতের রেকর্ড আইপিও

২৩ অক্টোবর শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিওতে মোট দরপ্রস্তাব ৭৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। শেয়ার বিক্রির প্রস্তাবের তুলনায় চাহিদা ছিল ২২ গুণেরও বেশি। বুধবার জনসাধারণের জন্য আবেদন শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই আইপিওটি পুরোপুরি সাবস্ক্রাইব হয়ে যায়।

প্রস্তাবটির মাধ্যমে জিও প্ল্যাটফর্মসের মূল্যায়ন সর্বোচ্চ ১০৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, আইপিওতে ১৩ দশমিক ৮ মিলিয়নের বেশি আবেদন জমা পড়ে—যা ভারতের কোনো আইপিওতে সর্বোচ্চ আবেদনসংখ্যা।

শুক্রবার বাজার বন্ধ হওয়ার সময় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ অংশে চাহিদা ছিল বরাদ্দের ৭০ দশমিক ৫৫ গুণ। খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশে চাহিদা ছিল ২ দশমিক ৭ গুণ। কর্মীদের জন্য বরাদ্দ অংশে ২ দশমিক ৯৩ গুণ এবং রিলায়েন্সের বিদ্যমান শেয়ারধারীদের অংশে ৭ দশমিক ৬ গুণ দরপ্রস্তাব জমা পড়ে।

আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি, ব্ল্যাকরক ও ফিডেলিটিসহ অ্যাঙ্কর বিনিয়োগকারীরা ৮৫৪ মিলিয়ন ডলারের জন্য নির্ধারিত শেয়ারের বিপরীতে মোট ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের দরপ্রস্তাব দিয়েছিলেন।

মুকেশ আম্বানির জন্য এই আইপিও দুই দশকের মধ্যে প্রথম বড় শেয়ারবাজারে প্রবেশের ঘটনা। এর আগে ২০০৬ সালে রিলায়েন্স গ্রুপের শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর দীর্ঘ বিরতি ছিল। নতুন আইপিওর চাহিদা এমন সময়ে এসেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা তৈরি হয়েছে।

দাদার উত্তরাধিকার, নতুন প্রযুক্তির লক্ষ্য

আকাশের দাদা ও রিলায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানি ১৯৮০-এর দশকে মুম্বাইয়ে বড় সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণকে সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ৯০০ শতাংশ মোট রিটার্ন দিয়েছে, যেখানে ভারতের নিফটি সূচকের রিটার্ন ছিল ৬৮৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৭২ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক আকাশ আম্বানি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের একটি ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১৯ সালে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে।

জিওর আইপিওর সাফল্য এখন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের পাশাপাশি আকাশের নেতৃত্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ৫০ কোটির বেশি গ্রাহক, মেটা ও গুগলের মতো বিনিয়োগকারী এবং এআই-ভিত্তিক সেবার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে টেলিকম থেকে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর কতটা আয় ও মুনাফায় প্রতিফলিত হয়, তা নির্ধারণ করবে জিওর পরবর্তী প্রবৃদ্ধি এবং রিলায়েন্সের উত্তরসূরি নেতৃত্বের বাস্তব সাফল্য।

//ডিবিটেক/রয়টার্স/এমএসআই/এমভিএনও//