নতুন লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্রের ঘোষণা

হরমুজের ইন্টারনেট ক্যাবল ঘিরে ইরানের হুমকি

  • হরমুজ প্রণালীর তলদেশের সাতটি ইন্টারনেট ক্যাবলকে সামনে এনেছে আইআরজিসি
  • নতুন লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্র উন্মোচনের হুমকি দিয়েছেন মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি
  • পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে

হরমুজের ইন্টারনেট ক্যাবল ঘিরে ইরানের হুমকি
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:০৫  

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিধি ডিজিটাল অবকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোর কথা উল্লেখ করে নতুন লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্র উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছেন বাহিনীটির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি। তার বক্তব্যে ক্যাবলগুলোকে সরাসরি হামলার লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি; তবে এর আগে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সমুদ্রতলদেশের ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি ও প্রেস টিভির বরাতে আনাদোলু এজেন্সি; আল জাজিরা; টেলিজিওগ্রাফি সূত্রে মিলেছে এইম শঙ্কার বার্তা। 

সাতটি ক্যাবল নিয়ে আইআরজিসির বার্তা

রাজধানী তেহরানের স্যাক্রেড ডিফেন্স মিউজিয়াম মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে গত ১৯ অক্টোবর, সোমবার বক্তব্য দেন আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রতিবেদনের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, তিনি হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে সাতটি বড় ইন্টারনেট ক্যাবল যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

মোহেব্বি বলেন, “হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে সাতটি বড় ইন্টারনেট ক্যাবল চলে গেছে। সমস্ত ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক ডেটা ট্রাফিক এগুলোর মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়।”

এরপর তিনি বলেন, “আমরা শুধু তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) জানাতে চাই যে, নতুন লক্ষ্যবস্তু উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। নতুন অস্ত্রও সামনে আনা হবে।”

তবে তাঁর বক্তব্যে কোন ক্যাবল, স্থাপনা বা নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সম্পদকে হামলার লক্ষ্য করা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। নতুন অস্ত্রের ধরন, সক্ষমতা কিংবা সেগুলো প্রকাশের সময় সম্পর্কেও কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

মোহেব্বি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবশিষ্ট প্রভাব ও শক্তি পুরোপুরি বিতাড়িত করার অঙ্গীকারও করেন। তাঁর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল, জ্বালানি পরিবহন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ তীব্র রয়েছে।

সমুদ্রতলদেশের ক্যাবল কেন গুরুত্বপূর্ণ

সমুদ্রতলদেশের ফাইবার-অপটিক ক্যাবল আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এগুলোর মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ইন্টারনেট ডেটা, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক তথ্য, ক্লাউড সেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তথ্য আদান-প্রদান হয়। বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ডেটা পরিবহনে এসব ক্যাবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

হরমুজ প্রণালী শুধু জ্বালানি পরিবহনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পথ। টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রণালীটির মধ্য দিয়ে যাওয়া ক্যাবলগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ-১ (এএই-১), ফ্যালকন এবং গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাবল সিস্টেম। ক্যাবলগুলো ও সংশ্লিষ্ট সংযোগপথের ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব নির্ভর করবে কোন নেটওয়ার্ক কতগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারে, তার ওপর।

তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া সাতটি ক্যাবলের গুরুত্ব তুলে ধরার সঙ্গে বিশ্বের সব ইন্টারনেট ট্রাফিক এগুলোর ওপর নির্ভরশীল—এমন বক্তব্য এক নয়। মোহেব্বির বক্তব্যটি তাঁর দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ অঞ্চলের ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংযোগে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে; কিন্তু এ অঞ্চলের কোনো দেশই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য শতভাগ সমুদ্রতলদেশের ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল নয়। স্থলভিত্তিক সংযোগ বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, যদিও সব ট্রাফিক অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা সব ক্ষেত্রে নাও থাকতে পারে।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ডেটা সেন্টারও লক্ষ্য হতে পারে

চলতি অক্টোবরের শুরুতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরও বিস্তৃত হুমকি দেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমুদ্রতলদেশের ইন্টারনেট ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

রেজায়ি বলেন, “আমরা এখনও এসব সম্পদ আমাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিনি।” তবে নতুন সংঘাত দেখা দিলে এ ধরনের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

প্রেস টিভিতে রেজায়ির বক্তব্যের পাশাপাশি আল জাজিরার ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণেও উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টার ও সমুদ্রতলদেশের ক্যাবলের ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) স্থাপনা সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয় এবং বাহরাইনে আরেকটি স্থাপনার কাছে হামলায় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, ডিজিটাল সেবা সচল রাখতে শুধু সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নয়, ভৌত অবকাঠামোর সুরক্ষাও জরুরি।

ডেটা সেন্টারে ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্যাংকিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল এবং নানা ধরনের অনলাইন সেবা পরিচালিত হয়। বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা বা টেলিযোগাযোগ সংযোগের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অচল হয়ে গেলেও একটি স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় হামলা হলে ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রাহক, ব্যবসা ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী হতে পারে

সমুদ্রতলদেশের ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশ বা নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, বিলম্ব বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বিকল্প পথে ডেটা পাঠানোর চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সব ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেই পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবলের সংখ্যা, সংশ্লিষ্ট দেশের সংযোগব্যবস্থা, বিকল্প রুটের সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্ক পরিচালকদের প্রস্তুতির ওপর।

টেলিজিওগ্রাফির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর কিছু স্থলভিত্তিক বিকল্প সংযোগ থাকলেও সমুদ্রতলদেশের একাধিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প নেটওয়ার্কে সব ডেটা স্থানান্তর করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ক্যাবল মেরামত করাও জটিল। মেরামতকারী জাহাজকে সংশ্লিষ্ট জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেতে হয়। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এসব বাধার কারণে সংযোগ পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নয়। নোঙর টানা, মাছ ধরার কার্যক্রম কিংবা জাহাজের দুর্ঘটনাও ক্যাবলের ক্ষতি করতে পারে। ফলে সংঘাতের মধ্যে জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠলে সরাসরি হামলা ছাড়াও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

হরমুজের নিরাপত্তা ও সংঘাতের পটভূমি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর জবাবে তেহরান অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে।

পরবর্তীতে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। তবে কৌশলগত জলপথটির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্যের কারণে সমঝোতা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া থমকে যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনেও জুনের সমঝোতার পর সংঘাতের মাত্রা কমলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল অবকাঠামোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তুলে ধরা সামরিক চাপ প্রয়োগের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে বক্তব্য দেওয়া এবং বাস্তবে কোনো স্থাপনায় হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত মোহেব্বির বক্তব্যে হরমুজের সাতটি ক্যাবলকে সরাসরি আক্রমণের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়নি।

প্রযুক্তি নিরাপত্তায় নতুন বাস্তবতা

ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে: ডিজিটাল অর্থনীতির বড় অংশ এমন ভৌত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, যা নির্দিষ্ট সমুদ্রপথ, উপকূলীয় অবতরণকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প আন্তর্জাতিক ক্যাবল রুট, স্থলভিত্তিক সংযোগ, একাধিক ডেটা সেন্টার, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত মেরামত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না; বিকল্প পথগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হয়।

হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব জ্বালানি পরিবহন ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক ইন্টারনেট, ক্লাউড সেবা, আর্থিক লেনদেন এবং এআই অবকাঠামোতেও পড়তে পারে। ফলে এই সংকট আর কেবল সামরিক বা জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

//ডিবিটেক/আইএমএস/এসএমপি/এমভিএনও//