ফিজিক্স টেস্ট শেষ, অনুমোদনের অপেক্ষা
রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বড় অগ্রগতি
- প্রথম ইউনিটের বি-২ পর্যায়ের পরীক্ষা শেষ; প্রতিবেদন জমা হয়েছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে
- অনুমোদন মিললে শুরু হবে পাওয়ার স্টার্টআপ; প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে
- চলতি বছরের শেষ দিকে ৩০০ মেগাওয়াট সরবরাহের প্রত্যাশা, উদ্বোধনের তারিখ এখনো অনিশ্চিত
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ অতিক্রম করেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে ফিজিক্স টেস্টসহ বি-২ পর্যায়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন মিললেই শুরু হতে পারে ‘সি-স্টেজ’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জাতীয় গ্রিডে সংযোগ এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময়সূচি এখনো অনুমোদন ও পরবর্তী কারিগরি কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২৫ অক্টোবর, রবিবার থেকে প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময়সূচি পাওয়া গেলে আগামী নভেম্বরের যেকোনো দিন প্রথম ইউনিটের উদ্বোধন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে উৎপাদন বাড়ানো হবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই টার্গেট ধরে চলতি বছরের শেষ দিকে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রত্যাশা করছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন। তবে এ সময়সূচি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরবর্তী কারিগরি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফিজিক্স টেস্ট শেষে পাওয়ার স্টার্টআপের প্রস্তুতি
এদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের বি-২ পর্যায়ের সব পরীক্ষা ও কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এ পর্যায়ের ফিজিক্স টেস্টও সম্পন্ন হয়েছে এবং পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে ইউনিটটি সি-স্টেজে প্রবেশ করবে এবং এরপর পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরু হবে।
নাম গোপন রাখার শর্তে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, বি-২ পর্যায়ের পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়াই পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এ নিয়ে ড. মো. জাহেদুল হাসান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাওয়ার স্টার্টআপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ। এ পর্যায়ে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় এবং পরিচালনাগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত মান পূরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত অনুসরণ করা জরুরি।
সূত্রমতে, ফিজিক্স টেস্ট সম্পন্ন হওয়াকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এর অর্থ এই নয় যে কেন্দ্রটি ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে চলে গেছে। পাওয়ার স্টার্টআপ, পরবর্তী পরীক্ষা, গ্রিডে সংযোগ এবং ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
জাতীয় গ্রিডে প্রথমে সীমিত বিদ্যুৎ
জানাগেছে, রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। তবে শুরুতেই ইউনিটটির পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথম ইউনিটের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। সেই হিসাবে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন প্রায় ৩৬০ থেকে ৪২০ মেগাওয়াটের সমান। তবে প্রকৃত গ্রিড সরবরাহের পরিমাণ নির্ভর করবে পরীক্ষার পর্যায়, কেন্দ্রের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহার, পরিচালনাগত শর্ত এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতির ওপর।
রূপপুরের দুটি ইউনিটের প্রতিটির স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৮ সালে চালু হলে দুটি ইউনিটের মোট স্থাপিত ক্ষমতা দাঁড়াবে ২৪০০ মেগাওয়াট। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে মোট চাহিদার কত অংশ পূরণ হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদা, প্রকৃত উৎপাদন ও কেন্দ্রের পরিচালনাগত অবস্থার ওপর। বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে রয়েছে।
রোসাটমের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর
রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন রোসাটমের প্রথম উপ-মহাপরিচালক এবং অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (এএসই) প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই পেত্রোভ। সফরকালে প্রতিনিধিদল প্রকল্পের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন জানান, প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গেও প্রতিনিধিদলের বৈঠকে প্রথম ইউনিটের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আন্দ্রেই পেত্রোভের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রকল্পের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্ট বৈঠকগুলোতে প্রথম ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পর্যায়, সামগ্রিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরার বিষয়টি জানানো হয়েছে। রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরীক্ষা, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কার্যক্রমে দুই পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি তাই প্রকল্পের পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
উদ্বোধনের অপেক্ষা, সময়সূচি এখনো অনিশ্চিত
প্রথম ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো শেষ হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে পাওয়ার স্টার্টআপ, পরবর্তী পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচি অনুযায়ী উদ্বোধনের আয়োজন করার প্রত্যাশা থাকলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য থাকলেও তা নির্ধারিত সময়েই শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রেস উইংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের জানানো হয়েছে রূপপুর উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রীর শিডিউল পেলেই উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ হবে। আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরের পর আরও কয়েকটি দেশে যাওয়ার কথা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে একটি সুবিধামতো সময় বেছে নেওয়া হবে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প উদ্বোধনের জন্য।”
সব মিলিয়ে, ফিজিক্স টেস্ট ও বি-২ পর্যায়ের কার্যক্রম শেষ হওয়া রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত সময় নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, পাওয়ার স্টার্টআপের ফলাফল এবং পরবর্তী নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষার ওপর।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এমএসআই/এসএমপি//





