মোট ডেটা ট্রাফিক ও আন্তর্জাতিক চাহিদার হিসাব নিয়ে ধোঁয়াশা

৫৪ টিবিপিএস, নাকি ৩০—ব্যান্ডউইথের হিসাবেই বড় ফারাক

  • ২০৩০ সালের ব্যান্ডউইথ চাহিদা নিয়ে ৩০, ৫০ ও ৫৪ টিবিপিএসের পূর্বাভাস
  • মোট ডেটা ট্রাফিকের বড় অংশ স্থানীয় ক্যাশিং ও সিডিএনে থেকে যাচ্ছে
  • বিতর্ক এখন সক্ষমতার চেয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের প্রকৃত হিসাব নিয়ে

৫৪ টিবিপিএস, নাকি ৩০—ব্যান্ডউইথের হিসাবেই বড় ফারাক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১১  
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৩৬  

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সরকারের হিসাব এখন কার্যত মুখোমুখি। বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল উদ্যোক্তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৪ টিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজনের পূর্বাভাস দিয়ে নতুন ক্যাবল সংযোগের দাবি তুলছেন। বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত অবকাঠামো ও বিকল্প গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, মোট ডেটা ট্রাফিক যত দ্রুতই বাড়ুক, তার বড় অংশ দেশের ভেতরেই স্থানীয় ক্যাশিং, কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) ও পিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরিবাহিত হচ্ছে। ফলে জাতীয় ডেটা ট্রাফিকের সঙ্গে প্রকৃত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদাকে এক করে দেখলে সংকটের হিসাব বড় হয়ে যেতে পারে।

বিতর্কের মূল জায়গাটি তাই শুধু কত টিবিপিএস ডেটা ব্যবহার হচ্ছে তা নয়; বরং সেই ডেটার কত অংশ সীমান্ত অতিক্রম করছে, কত অংশ স্থানীয়ভাবে পরিবেশিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের কতটুকু সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে আসছে- তার হিসাবটাও জরুরী।

ব্যবহৃত ১৩.৫ টিবিপিএস কোথা থেকে আসছে?
সাম্প্রতিক শিল্পখাতের উপস্থাপনা অনুযায়ী, দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটস পার সেকেন্ড (টিবিপিএস)-এ পৌঁছেছে। ২০১৩ সালে যা ছিল মাত্র ৫০ গিগাবিটস পার সেকেন্ড (জিবিপিএস), ২০১৮ সালে ০ দশমিক ৭৬ টিবিপিএস, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টিবিপিএস, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টিবিপিএস এবং ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টিবিপিএস। অর্থাৎ ১৩ বছরে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ২৬০ গুণ বেড়েছে।

দেশের বর্তমান আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রধান সরকারি অবকাঠামো সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দুই সাবমেরিন ক্যাবলের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ দশমিক ১ থেকে ৭ দশমিক ২ টিবিপিএস। বিএসসিপিএলসির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত আপগ্রেডের মাধ্যমে এই সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে এখানেই রয়েছে হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

খাতসংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের মোট ডেটা ট্রাফিকের ৩০ শতাংশেরও কম এখন আন্তর্জাতিকভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে; স্থানীয় ক্যাশিং, সিডিএন ও পিয়ারিংয়ের কারণে এই অনুপাত ধীরে ধীরে আরও কমছে। এই আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের মধ্যেও বিএসসিপিএলসির সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪ টিবিপিএস পরিবাহিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অবশিষ্ট বড় অংশ ভারত থেকে আইটিসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় ব্যবহারকারীদের কাছে কনটেন্ট প্রোভাইডার ও সিডিএন-নির্ভর ট্রাফিক পৌঁছে দিচ্ছে।

অর্থাৎ, জাতীয় ডেটা ট্রাফিক, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার এবং সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে বহন করা প্রকৃত আন্তর্জাতিক ট্রাফিক-তিনটি একই বিষয় নয়।

৫৪ টিবিপিএসের পূর্বাভাস
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ চাহিদা ২০২৭ সালে ১৯ দশমিক ১ টিবিপিএস, ২০২৮ সালে ২৭ টিবিপিএস, ২০৩০ সালে ৫৪ টিবিপিএস এবং ২০৩৫ সালে ৩০৫ টিবিপিএস-এ পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক শিল্পখাতের কর্মশালাতেও একই ধরনের পূর্বাভাস উপস্থাপিত হয়েছে। 

মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলছেন, বেসরকারি ক্যাবল যুক্ত না হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়বে এবং আইটিসি নির্ভরতা বাড়বে।

বেসরকারি ক্যাবল ছাড়া ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ইন্টারনেটের চাহিদা বহুগুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দেশে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল বা নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগ যুক্ত না হলে ভারতের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যান্ডউইথ ঘাটতির কারণে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ইন্টারনেট সেবার মান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যা মোকাবিলায় অবকাঠামোগত বহুমুখীকরণ জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি ক্যাবল চালু হলে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, সেবার মান বাড়বে এবং ডেটা ল্যাটেন্সি কমে আসবে। তিনি আরও মনে করেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবৃদ্ধিও বাড়তে পারে।

‘আন্তর্জাতিক’ ব্যান্ডউইথের বড় অংশ কি আসলে সিডিএন?
এই প্রশ্নটিই সামনে আনছেন বাংলাদেশ সাবমেরিন কোম্পানি পিএলসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মোঃ আরিফুল হক।

তার মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় শুধু কত টিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন তা নয়, বরং ব্যান্ডউইথের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহারকে আলাদাভাবে দেখা জরুরি। 

ব্যান্ডউইথের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহারকে আলাদাভাবে দেখা জরুরি

তিনি বলেন, ভারত থেকে আসা তথাকথিত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বড় অংশ আসলে সিডিএন-নির্ভর কনটেন্ট ট্রাফিক, যা মূলত ফেসবুক, গুগল বা আকামাই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সার্ভার থেকে আসে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, যদি এসব প্রতিষ্ঠানের Edge ডেটা সেন্টার বাংলাদেশে স্থাপন করা যায়, তবে এই ট্রাফিকের বড় অংশ দেশের ভেতরেই পরিবেশিত হবে এবং আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ব্যান্ডউইথের প্রকৃত চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তাই ইন্টারনেট ও সিডিএন-কে একসঙ্গে ধরে করা ব্যান্ডউইথ পূর্বাভাসকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ভবিষ্যৎ চাহিদা হিসেবে ধরা বিভ্রান্তিকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

এই যুক্তির সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। টেলিজিওগ্র্রাফি (TeleGeography) বলছে, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে কনটেন্ট প্রোভাইডার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য নিজস্ব নেটওয়ার্কের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্যাশিং ও কন্টেন্ট জেনারেশন আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।

সরকারের হিসাবে সংকট কোথায়?
ব্যান্ডউইথের অনুমেয় চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বেসরকারি খাতে লাইসেন্স অনুমোদনে বাধা কোথায় বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, একক অনুমোদন পেলেও কোম্পানিগুলো কনসোর্টিয়াম গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো পূর্বানুমোদন নেয়নি। 

২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ব্যান্ডউইথ বেড়ে হবে ৪১ টিবিপিএস

মন্ত্রী বলেছেন, তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের যন্ত্রপাতি স্থাপন ও কার্যকারিতা পরীক্ষা ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত সক্ষমতায় আরও ১৭ টিবিপিএস যোগ হয়ে মোট সক্ষমতা প্রায় ৪১ হাজার জিবিপিএস বা ৪১ টিবিপিএস হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। ফলে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা নাকচ করে দেন মন্ত্রী।

বিএসসিপিএলসির নিজস্ব তথ্যেও ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় এসএমডব্লিউ-৬ প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে এবং প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের আয়ুষ্কাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে চতুর্থ সাবমেরিনে সযুক্ত হতে কাজ শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে বিএসসিপিএলসি।   

এসব পরিসংখ্যানগত বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে একটি সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী সরকারি ডেটাবেইসগুলোকে একটি ‘সংযুক্ত ইকোসিস্টেমে’ এনে দায়িত্বশীল ডেটা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।

২০৩০ সালের লক্ষ্য ৫০ টিবিপিএস সক্ষমতা 
একইসঙ্গে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, প্রতি আড়াই বছরে বাংলাদেশের ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে।

কক্সক্সবাজারা-কুয়াকাটার পর লক্ষ্য ‘খ’ খুলনা বন্দর

তিনি বলেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৭ সালের শেষে ট্রাফিক ২০ টিবিপিএস এবং ২০৩০ সালে তা ৫০ টিবিপিএসে পৌঁছাতে পারে। সেই লক্ষ্য ধরেই সরকার কাজ করছে জানিয়ে বর্তমানে সাবমেরিন ক্যাবলের জন্য কক্সবাজার ও কুয়াকাটা ব্যবহৃত হলেও আগামীতে খুলানার মংলা বন্দর দিয়েও সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের দূরদর্শী পরিকল্পনা উঠে আসে তার বক্তব্যে।

একই সঙ্গে তার বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা এসেছে। বাংলাদেশের পিক ইন্টারনেট ট্রাফিক বর্তমানে প্রায় ১২ দশমিক ১ টিবিপিএস এবং ২০৩০ সালে তা প্রায় ৩০ টিবিপিএসে উঠতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার অন্তত ৫০ টিবিপিএস সক্ষমতা গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে।

এই চাহিদা নিশ্চিত করতে আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অন্তত তিনটি নতুন ক্যাবল প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি অভিমত দিয়েছেন।

‘মাল্টিপল সাবমেরিনের বিকল্প নেই’
এই প্রয়োজনের সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে আইএসপিএবি জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন, মাল্টিপল সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প নেই।

ব্যাকআপ, লো-ল্যাটেন্সি ও লেস কনজেশানের জন্য মাল্টিপল সাবমেরিন

তার ভাষায়, ‘ব্যাকআপ, লো-ল্যাটেন্সি ও লেস কনজেশান এর জন্য মাল্টিপল সাবমেরিন দরকার হয়। এতে করে কোয়ালিটি অব সার্ভিস দেয়ার ক্ষেত্রে রাউট ব্যাকআপ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে কনজেশান ফ্রি ও লো-ল্যাটেন্সি নেটওয়ার্কের কল্যাণে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘তাই সরকারি বা বেসরকারি বা যৌথভাবেও হলেও মাল্টিপল সাবমেরিন ক্যাবল দেশে আসা যুক্তিসঙ্গত। কেননা, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি মাল্টিপল অপশন ও রিড্যাডেন্সির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এতে ডিজিটাল সড়ক হবে আরও প্রশস্ত।’

অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রকৃত চাহিদা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নেটওয়ার্কের রিডানড্যান্সি ও রেজিলিয়েন্স নিয়ে শিল্পখাতের উদ্বেগ আলাদা এবং তা কেবল চাহিদার পূর্বাভাস দিয়ে খারিজ করা যায় না।

টেলিজিওগ্রাফি’র ২৪ শতাংশ হিসাব
বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফি (TeleGeography) -এর ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ২০২৫–২০৩৫ সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৪ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এই বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তির মধ্যে রয়েছে কনটেন্ট প্রোভাইডার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক এবং এআই-সম্পর্কিত অবকাঠামো। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রায় ৭৫ শতাংশই কনটেন্ট প্রোভাইডার শ্রেণির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে টেলিজিওগ্রাফি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে ১৩ দশমিক ৫ টিবিপিএস থেকে একই ২৪ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার চার বছর প্রয়োগ করলে ২০৩০ সালে গাণিতিকভাবে প্রায় ৩২ টিবিপিএস-এ দাঁড়ায়। অর্থাৎ এটি ৫৪ টিবিপিএসের বেসরকারি পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। কেননা টেলিজিওগ্র্যাফি’র ২৪ শতাংশ হলো বৈশ্বিক used international bandwidth-এর CAGR, বাংলাদেশের নিজস্ব পূর্বাভাস নয়। বাংলাদেশের ওপর এই হার সরাসরি প্রয়োগ করা কেবল একটি গাণিতিক scenario, স্বাধীন পূর্বাভাস নয়। কেননা গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি নিজেও বলছে, caching ও content localization আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের প্রকৃত প্রয়োজন কমিয়ে দিতে পারে।

৮৫–৯৩ টিবিপিএসের হিসাবেও প্রশ্ন
দেশের ব্যান্ডউইথের ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে এমন বিপরীতমুখী পূর্বাভাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন টেলিযোগাযোগ নীতি ও প্রকৌশল বিশ্লেষক মো. মুনির হাসান।

বটম-আপ গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের হিসাব ও মোট ডেটা ব্যবহারের মধ্যে তাত্ত্বিক ফারাক রয়েছে।

চাহিদার মডেল স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন; গুরুত্বপূর্ণ চলক লোকালইজেশন

ব্যান্ডউইথের অনুমিত চাহিদার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন "আসলে, '২০৩০ সালের মধ্যে ৫০–৫৪ টিবিপিএস' এই ধারণাটি কোথা থেকে এসেছে?

এই সংখ্যাটি ভুল হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। তবে এর পেছনে যে চাহিদার মডেল রয়েছে, সেটি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এটি কি মোট ট্র্যাফিক, আন্তর্জাতিক ট্র্যাফিক, পিক ট্র্যাফিক নাকি প্রকৌশলগত সক্ষমতা (engineered capacity)?

এবং লোকালইজেশন (localisation), সিডিএন (CDN), ক্যাশিং (caching) এবং আইটিসি (ITC) সম্পর্কে এটি কী কী অনুমান করে?

আইএসপিএবি (ISPAB) এর আগে জানিয়েছিল যে, বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের ৮০% এর বেশি ট্র্যাফিক সাধারণত স্থানীয় ক্যাশে সার্ভারের মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়। এ কারণে লোকালইজেশন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলক।"

তার হিসাব অনুযায়ী, দেশের সাড়ে আট কোটি সক্রিয় গ্রাহক ও ডিভাইসপ্রতি ডেটা খরচের ভিত্তিতে ২০৩০ সালে সামগ্রিক জাতীয় ট্রাফিক ৮৫ থেকে ৯৩ টিবিপিএস-এ উঠলেও তার প্রায় ৭০ শতাংশ ডেটা স্থানীয় কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, লোকাল ক্যাশিং ও পিয়ারিং সার্ভারের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরেই আদান-প্রদান হতে পারে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) তথ্যও দেখিয়েছে, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি ডেটা ট্রাফিক স্থানীয় ক্যাশ সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের একটি নেটওয়ার্ক পরিস্থিতিতেও আইএসপি খাতের পক্ষ থেকে ৮০ শতাংশের বেশি ট্রাফিক স্থানীয় ক্যাশে পরিবেশিত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

মনির হাসানের বিশ্লেষণ বলছে, ২০৩০ সালে সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রকৃত আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের পরিমাণ দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ২৬ থেকে ২৮ টিবিপিএস। এর মধ্যে আইটিসি বাদ দিলে সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর প্রকৃত চাপ দাঁড়াবে ১৯ থেকে ২১ টিবিপিএস। 

এমনকি বার্ষিক ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ৬০ শতাংশ স্থানীয় ক্যাশ ধরে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এই চাহিদা ৩০ টিবিপিএসের বেশি হবে না, যা সি-মি-উই-৬ চালুর পর তৈরি হতে যাওয়া প্রায় ৪১ টিবিপিএস রাষ্ট্রায়ত্ত সক্ষমতার সীমার মধ্যেই থাকবে বলে তার মডেলে উঠে এসেছে।

তাহলে আসল সংকট কোথায়?
এখানেই ব্যবসায়ী ও সরকারের হিসাবের মৌলিক পার্থক্য।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার দ্রুত ৫৪ টিবিপিএসের দিকে যাচ্ছে। সরকারের এক হিসাবে ২০৩০ সালের পিক ট্রাফিক প্রায় ৩০ টিবিপিএস, আর আরেকটি গাণিতিক মডেলে স্থানীয় ক্যাশিং বাদ দিলে সীমান্ত অতিক্রমকারী আন্তর্জাতিক ট্রাফিক ২৬–২৮ টিবিপিএসের মধ্যে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, ১৩ দশমিক ৫ টিবিপিএসকে ভিত্তি করে বৈশ্বিক টেলিজিওগ্রাফি-র ২৪ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার অনুমান প্রয়োগ করলে ২০৩০ সালের একটি গাণিতিক চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩২ টিবিপিএস।

তাই ৫৪ টিবিপিএস বনাম ৩০–৩২ টিবিপিএস পার্থক্যটি নিছক মতের পার্থক্য নয়; এটি মূলত কোন ডেটাকে ‘আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা’ বলা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মোট অভ্যন্তরীণ ডেটা, পিক-আওয়ার ট্রাফিক, আন্তর্জাতিক ট্রানজিট এবং প্রকৃত সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ আমদানির পার্থক্য স্পষ্ট না করে সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের হিসাব কম হলেও একটি বা দুটি রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সাবমেরিন ক্যাবল বিচ্ছিন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, ল্যাটেন্সি এবং রুট ব্যাকআপের ঘাটতি নেটওয়ার্কের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। টেলিজিওগ্রাফি-ও নতুন আন্তর্জাতিক অবকাঠামো, কনটেন্ট লোকালাইজেশন এবং আঞ্চলিক সংযোগকে ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্ক স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছে।

অতএব বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু ‘২০৩০ সালে কত টিবিপিএস লাগবে?’ নয়। বরং প্রশ্ন রাখা যেতে পারে কত টিবিপিএস প্রকৃত আন্তর্জাতিক ট্রাফিক, কতটুকু স্থানীয়ভাবে ক্যাশ করা যায়, কতটুকু আইটিসি দিয়ে আসবে, কতটুকু সাবমেরিনে প্রয়োজন হবে এবং সেই সক্ষমতার কতটুকু রিডানড্যান্সি হিসেবে হাতে রাখা হবে।

এই চারটি হিসাব একসঙ্গে না মিললে ৫৪ টিবিপিএসের পূর্বাভাস যেমন অতিরঞ্জিত হতে পারে, তেমনি ৪১ টিবিপিএস সক্ষমতা যথেষ্ট- এমন সিদ্ধান্তও আগেভাগে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের ডিজিটাল সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি সেই সড়কে বিকল্প রুট, কম ল্যাটেন্সি ও পর্যাপ্ত রিডানড্যান্সি নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 
//ডিবিটেক/ আইএইচ/এনএপি/এমআইএসটি//