১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করছে কানাডা  

১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করছে কানাডা  
১১ জুন, ২০২৬ ১৬:৫৫  

অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার পথ অনুসরণ করে এবার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কানাডা সরকার। দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো কিশোর-কিশোরী আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া (যেমন- ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স বা স্ন্যাপচ্যাট) ব্যবহার করতে পারবে না। কানাডার ‘কানাডিয়ান আইডেন্টিটি অ্যান্ড কালচার’ বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক মিলার গতকাল বুধবার (১০ জুন) ওটাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিলটি উত্থাপন করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেফ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্ট’ বা বিল সি-৩৪।  

এই আইনের আওতায় কেবল সোশ্যাল মিডিয়াই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট সেবাগুলোর ওপরেও প্রথমবারের মতো কঠোর রাষ্ট্রীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হচ্ছে।  

১. ‘সেফ বাই ডিজাইন’ এবং ২৪ ঘণ্টার ডেডলাইন
কানাডা সরকারের এই নতুন বিলের মূল লক্ষ্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরো ইকোসিস্টেমটিকে শিশুদের জন্য গোড়া থেকে নিরাপদ বা ‘সেফ বাই ডিজাইন’ হিসেবে পুনর্গঠন করা। আইন অমান্য করলে টেক জায়ান্টগুলোর ওপর নেমে আসবে বড় বিপর্যয়। খসড়া আইন অনুযায়ী, নিয়ম ভঙ্গকারী কোম্পানিগুলোকে তাদের বিশ্বব্যাপী আয়ের (Global Revenue) ৩ শতাংশ অথবা ১০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (যা বেশি) জরিমানা করা হতে পারে।  

বিলের প্রধান শর্তগুলোহলো:
    ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কনটেন্ট অপসারণ: কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, সাইবার বুলিং, আত্মহত্যায় প্ররোচনামূলক উপাদান কিংবা সম্মতিহীন কৃত্রিম নগ্ন ছবি আপলোড করা হলে, তা রিপোর্ট করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হবে।  

    এআই কনটেন্ট লেবেলিং: এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি যেকোনো ছবি, ভিডিও বা টেক্সটের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘এআই জেনারেটেড’ লেবেল বা জলছাপ দিতে হবে।  

    অ্যাডিকশন বা আসক্তি প্রতিরোধ: অ্যাপের স্ক্রলিং ডিজাইন বা অ্যালগরিদম এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যাতে শিশুরা এতে আসক্ত না হয়ে পড়ে।  

২. ভিন্ন পথে এআই চ্যাটবট: বয়সসীমা নেই, কিন্তু জবাবদিহিতা কঠোর
সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হলেও, চ্যাটজিপিটি বা ক্লড-এর মতো এআই চ্যাটবটগুলোর জন্য কোনো বয়সসীমা রাখেনি কানাডা সরকার।  

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী মার্ক মিলার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, "চ্যাটবটগুলো সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়ার মতো কাজ করে না এবং এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন তথ্য এখনো গবেষণায় পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। তাছাড়া আমাদের এআই স্ট্র্যাটেজি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় চ্যাটবটের একটি বড় শিক্ষণীয় ভূমিকা রয়েছে।"

তবে চ্যাটবটকে ছাড় দেওয়া হলেও সম্প্রতি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ‘টাম্বলার রিজ’-এ ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক বন্দুক হামলার ঘটনায় ওপেনএআই-এর চ্যাটবটের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিলে চ্যাটবটের জন্য বিশেষ কিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে:  

    চ্যাটবট যাতে ব্যবহারকারীর সাথে কোনো ক্ষতিকর বা উসকানিমূলক আচরণ/বার্তা আদান-প্রদান না করে, তা কোম্পানিকে নিশ্চিত করতে হবে।

    কোনো ব্যবহারকারী যদি চ্যাটবটের কাছে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার (আত্মহত্যা বা সহিংসতা) ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে চ্যাটবটকে সাথে সাথে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ইমার্জেন্সি প্রোটোকল’ বা জরুরি ক্রাইসিস রেসপন্স ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

৩. নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা: ডিজিটাল সেফটি কমিশন
এই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং তদারকির জন্য কানাডা সরকার সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করছে, যার নাম ‘ডিজিটাল সেফটি কমিশন অব কানাডা’।  

কমিশনের কাছে একটি বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে—যদি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম প্রমাণ করতে পারে যে তাদের অ্যাপে শিশুদের সুরক্ষার জন্য ‘পর্যাপ্ত এবং নিখুঁত সেফগার্ড’ রয়েছে, তবে কমিশন চাইলে সেই প্ল্যাটফর্মকে ১৬ বছরের বয়সসীমার এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে আংশিক বা পূর্ণ অব্যাহতি দিতে পারে। তবে অ্যাডাল্ট বা পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলোর ক্ষেত্রে এই ছাড় কোনোভাবেই প্রযোজ্য হবে না।  

    বিশেষজ্ঞদের মতামত: ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর প্রযুক্তি ও প্রাইভেসি বিষয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ব্রেট ক্যারাওয়ে বলেন, "অস্ট্রেলিয়ার আইনটি ছিল মূলত শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখার একটি নিষেধাজ্ঞা মাত্র। কিন্তু কানাডার এই আইনটি তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত এবং দূরদর্শী। কারণ এটি কেবল প্রবেশাধিকার বন্ধ করছে না, বরং এআই এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভেতরের পুরো কাঠামোটিকেই শিশুদের উপযোগী করে নতুনভাবে তৈরি করতে বাধ্য করছে।"

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল সরকার বিলটি পার্লামেন্টে পাস করতে এবং নতুন এই ডিজিটাল কমিশন গঠন করে সম্পূর্ণ আইনটি কার্যকর করতে আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মেটা এবং গুগল ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে তারা কানাডা সরকারের এই নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ডের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।    সূত্র: এনগ্যাজেট