৩২ দেশের গবেষকদের অংশগ্রহণে এসটিআই ২০২৫  শুরু: 

মানুষকে শক্তিশালী করাই প্রযুক্তির লক্ষ্য: আইসিটি সচিব

মানুষকে শক্তিশালী করাই প্রযুক্তির লক্ষ্য: আইসিটি সচিব
১১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১০:৪৪  
১১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১১:২৮  

আন্তর্জাতিক পেশাগত সংগঠন আই-ইইই কম্পিউটার সোসাইটি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আয়োজনে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল আমেরিকান সিটিতে অবস্থিত গ্রিন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের (জিইউবি) স্থায়ী ক্যাম্পাসে শুরু হলো দুই দিনের সপ্তম আই-ইইই এসসিআই আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ১১ ডিসেম্বর, বৃহস্পিতিবার সকালে ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-তে টেকসই প্রযুক্তি নিয়ে শুরু হওয়া সম্মেলন উদ্বোধন করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ৫.০–এর মূল দর্শন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন “মানুষকে শক্তিশালী করাই প্রযুক্তির লক্ষ্য। প্রযুক্তিকে মানুষের জায়গা দখল করতে নয়, বরং মানুষের বিকাশকে ত্বরান্বিত করার জন্যই ব্যবহার করতে হবে।”

‘বাংলাদেশ এখন উন্নত প্রযুক্তির নতুন এক দিগন্তে দাঁড়িয়ে’ উল্লেখ করে সরকারের আইসিটি সচিব জানান, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও সরকারি সংস্থা- এই তিন পক্ষ সমন্বিতভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেবে।

তার ভাষায়, “একাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রি–গভর্নমেন্ট এই ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় ছাড়া প্রযুক্তিগত রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়।”

ডেটা সুরক্ষা ও নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে এবং সরকারের চলমান নীতিমালা সংস্কারের কথা উল্লেখ করে শিষ হায়দার চৌধুরী বলেন, দেশব্যাপী ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল ডেটা সুরক্ষা আইন, সাইবার নিরাপত্তা নীতি, এআই নীতি, ব্লকচেইন নীতি, ক্লাউড ফ্রেমওয়ার্ক- সবকিছুই নতুনভাবে প্রণয়ন ও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

তিনি মন্তব্য করেন, “ডিজিটাল অর্থনীতি টেকসই করতে হলে ডেটা গভর্নেন্সকে শক্তিশালী করা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। ব্যবহারকারীর আস্থা রক্ষা করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”

উদ্ভাবন ও স্টার্টআপে তরুণদের সম্পৃক্ততার আহ্বান জানিয়ে প্রধান অতিথি যুবসমাজের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইনোভেশন হাব হয়ে উঠুক। শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান অর্জন করবে না—তারা নিজেরাই প্রযুক্তি তৈরি করবে, স্টার্টআপ গড়বে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করবে।”

তিনি আরো বলেন, সরকারের আইডিয়া প্রোজেক্ট, স্টার্টআপ বাংলাদেশ, ডিড অ্যাকাডেমি, হাইটেক পার্কসমূহকে আরও বিস্তৃতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। তাই “আইডিয়া থাকলে অর্থায়নের অভাব হবে না”।

জিইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক ও গ্রিন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন ড. মো. সাইফুল আজাদ। ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আই-ইইই বাংলাদেশ সেকশনের চেয়ার ড. এম ইমামুল ইসলাম ভূঁইয়া।

“টেকসই শক্তি ছাড়া প্রযুক্তির অগ্রগতি অসম্ভব” নয় মন্তব্য করে অধ্যাপক ড. ইমামুল হাসান ভুঁইয়া বলেন, “এআই, রোবটিক্স, আইওটি—এই সব প্রযুক্তির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হচ্ছে এনার্জি। তাই টেকসই শক্তি নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি স্থায়ী হবে না।” তিনি বলেন, বাংলাদেশে তরুণ গবেষকদের দ্রুত অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করছে।

“ইন্ডাস্ট্রি ৫.০–তে মানুষই প্রযুক্তির কেন্দ্র” হবে মন্তব্য করে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ইন্ডাস্ট্রি ৫.০ হলো মানবকেন্দ্রিক শিল্পায়ন—যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও নিরাপত্তাকে বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হবে।” তিনি ডিজিটাল টুইন, সেমান্টিক কমিউনিকেশন, রোবোটিক্স ও শক্তি–দক্ষ প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অর্গানাইজিং চেয়ার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সাইফুল আজাদ বলেন, এসটিআই ২০২৫০- এ এবার রেকর্ড ৪৩৪টি প্রবন্ধ জমা পড়েছে। এসটিআই ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ। সাইটেশন পেপার সম্পাদনায় ৬ জন রিভিউয়ারের মধ্যে ৩ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের কঠোর মূল্যায়নের পর গৃহীত হয়েছে মাত্র ১১৮টি প্রবন্ধ। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্যতার হার মাত্র ২৭%। তিনি বলেন, এটি প্রমাণ করে এসটিআই গবেষণার মান নিয়ে কোনও ছাড় দেয় না।

তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সাল থেকে এসটিআই –তে অংশ নিয়েছেন ৬০টিরও বেশি দেশের গবেষক ও শিল্প–বিশেষজ্ঞ, আর প্রকাশিত প্রবন্ধে পাওয়া গেছে ২০০০- এর বেশি সাইটেশন।

অনুষ্ঠানের শেষে গ্রিন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শফিউর রহমান প্রধান অতিথির হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এসটিআই ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি গবেষণা সম্মেলনে পরিণত হবে। ভবিষ্যতের শিল্পায়ন আর কেবল অটোমেশন বা ডিজিটালাইজেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না- প্রযুক্তি হবে মানবকেন্দ্রিক, টেকসই এবং রেজিলিয়েন্ট।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের আয়োজনে এবং আইইইই কম্পিউটার সোসাইটি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ৩২টির বেশি দেশের অংশগ্রহণ করছে।

ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম