ইন্টারনেটেও ‘কপি-পেস্ট’ নির্ভরতা শহর-গ্রাম ব্যবধানের বৈষম্য স্পষ্ট
দেশের ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন
দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এরমধ্যে পুরুষ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ব্যবহারকারী ৫০ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে ১৭ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহারিক’ জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিবিএস অডিটরিয়ামে এই জরিপ প্রকাশ করা হয়। জরিপে দেশের ডিজিটাল বাস্তবতার এক বৈষম্যমূলক চিত্র ফুটে উঠেছে।
ডিভাইস প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতাও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে। জরিপ বলছে, গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের কাছে কম্পিউটার রয়েছে। শহরে এই হার ২১ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় ফারাক দেখা যায়—গ্রামে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করে, যেখানে শহরে তা ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও বিস্ময়ের বিষয়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বড় অংশের ডিজিটাল দক্ষতা কেবল ‘কপি-পেস্ট’ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আঞ্চলিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ইন্টারনেট ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে পঞ্চগড়ে এই ব্যবহার সবচেয়ে কম। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে, আর ঠাকুরগাঁও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। এতে দেশের ভৌগোলিক ডিজিটাল বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় এখনও ঘাটতি রয়েছে। দেশে মোট ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের। অন্যদিকে, কম্পিউটার ব্যবহারের হার এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, যা মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে।
পরিবারভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। ঢাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সবচেয়ে বেশি হলেও পঞ্চগড়ে তা সর্বনিম্ন। একইভাবে কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে থাকলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ঠাকুরগাঁও।
ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন মাসে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করেছে। ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ খেলাধুলা সম্পর্কিত তথ্য দেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও কনটেন্ট ব্যবহারের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে কম। মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী অনলাইনে কেনাকাটা করেছে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনার তুলনায় এখনও সীমিত অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের মধ্যে মৌলিক কাজের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। কপি-পেস্ট করার দক্ষতা ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারীর মধ্যে রয়েছে, যা সবচেয়ে সাধারণ ডিজিটাল কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এর বাইরে উন্নত দক্ষতার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে জরিপে। ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে ঝুঁকিও কম নয়। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ভাইরাস ও ম্যালওয়্যারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে, ইন্টারনেট সেবার উচ্চমূল্যও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামনে এসেছে। জরিপে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন, উচ্চ খরচের কারণে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল সেবা সবার নাগালে আনতে হলে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নেও জোর দিতে হবে।
ডিবিটেক/ডিএইচই/ইকে







