দেশীয় প্রযুক্তি, গ্রিন বিল্ডিং ও উদ্ভাবনী নকশায় টেকসই স্থাপত্যের নতুন প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন

জলবায়ু-সহনশীল স্থাপত্যে শুরু ‘ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড’ যাত্রা

  • ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে প্রথম ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার
  • স্থানীয় উপকরণ ও গ্রিন প্রযুক্তিভিত্তিক স্থাপত্যে গুরুত্বারোপ
  • পরিবেশবান্ধব নির্মাণে অর্থায়ন ও উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

জলবায়ু-সহনশীল স্থাপত্যে শুরু ‘ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড’ যাত্রা
১৬ জুলাই, ২০২৬ ২২:৩৩  

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের উপযোগী স্থানীয় প্রযুক্তি, দেশীয় নির্মাণ উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন নির্ভর স্থাপত্যশিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাণ খাতের বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে পরিবেশ-সহনশীল ও উদ্ভাবনী স্থাপত্যচর্চাকে উৎসাহিত করতে আগামী ১২ নভেম্বর প্রথমবারের মতো ‘ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকা শেরাটন হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হাতের তালুর স্পর্শে অ্যাওয়ার্ডের লোগো, ট্রফি এবং অনলাইন আবেদন গ্রহণের ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল স্থাপত্যচর্চাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশল ও স্থাপত্য শিল্প নিয়ে একটি বিশেষ মেলারও ঘোষণা দেওয়া হয়। সেমিনারে বক্তারা সমন্বিত ইকোসিস্টেম, গ্রিন বিল্ডিং ফাইন্যান্স এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থপতি ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সভাপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, নতুন এই অ্যাওয়ার্ড স্থাপত্য গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নদী, পানি ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক জ্ঞানের পাশাপাশি চুন-সুরকি, বাঁশ, শাল ও জারুল কাঠের মতো দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের উদ্ভাবনী ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, একটি ভবন শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগ বিবেচনায় রেখে 'ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক' গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় উপকরণের আধুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, টেকসই ও সবুজ স্থাপত্যশিল্প গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আর্কি কানেক্টের প্রতিষ্ঠাতা জালাল আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠানটি হোমস, একাডেমি, স্টোর এবং প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ ‘স্থাপত্য শিল্প’—এই চারটি স্তম্ভের মাধ্যমে একটি সমন্বিত স্থাপত্য ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, আগামী ১২ থেকে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ‘ডেল্টা ফেস্টিভ্যাল অব আর্কিটেকচার’, যা ‘৩১তম বিল্ড বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো ২০২৬’-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে।

তার ভাষ্য, আর্কি কানেক্ট, সেমস-গ্লোবাল এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা ও গ্রিন আর্কিটেকচারের প্রসার। ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড, আঞ্চলিক রোডশো, প্রকল্প প্রদর্শনী ও মনোগ্রাফ উন্মোচনের মাধ্যমে দেশের স্থাপত্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং একটি স্থায়ী আর্কিটেকচারাল আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, নতুন এই অ্যাওয়ার্ড স্থপতিদের উদ্ভাবনী নকশা ও টেকসই উন্নয়নে আরও উৎসাহিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভূমি-সংকটের কারণে দ্রুত বহুতল ভবনের দিকে এগোচ্ছে। তাই এখন প্রয়োজন হাইরাইজ ভবনেও কীভাবে রিসাইকেলড ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে উদ্ভাবনী স্থাপত্য বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি করা।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের ইডিজিই (EDGE) প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গ্রিন বিল্ডিং লিড আতিফ সাঈদ বলেন, টেকসই নকশা ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাব পরিবেশ, সমাজ এবং বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রকৃত গ্রিন বিল্ডিং নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি জানান, রাজউকের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রিন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ এবং গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নে আইএফসি কাজ করছে। পাশাপাশি ভবনকে জলবায়ু দুর্যোগ-সহনশীল করতে বিল্ডিং রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স নিয়েও কাজ চলছে।

সভাপতির বক্তব্যে সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিকের প্রেসিডেন্ট ও গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহেরুন এন. ইসলাম বলেন, স্থপতি, প্রকৌশলী, ডেভেলপার এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত অংশগ্রহণেই স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর মতে, ডেল্টা অ্যাওয়ার্ড প্ল্যাটফর্ম নকশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি গ্রিন বিল্ডিং ফাইন্যান্স, জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পের দৃশ্যমানতা এবং টেকসই নির্মাণশিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আর্কি কানেক্ট ও সেমস-গ্লোবাল যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রয়েছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এবং হোস্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে ৩১তম বিল্ড বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো ২০২৬।

//ডিবিটেক/এসএইচ/এমআইএস//