কৃষিবিদ্যুতে জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা

একই জমিতে ফসল ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব

  • কৃষিবিদ্যুৎ একই জমিতে ফসল ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ
  • বরেন্দ্র অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ
  • পানি, সেচ ব্যয় ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা

একই জমিতে ফসল ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:১৯  

একই জমিতে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে ‘এগ্রিভোল্টিক্স’ বা কৃষিবিদ্যুৎ। বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক নতুন এই প্রযুক্তি এখনো সাধারণ মানুষ ও কৃষকের কাছে খুব বেশি পরিচিত না হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর সফল প্রয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে চীনে বড় পরিসরে কৃষিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

৩ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) কৃষিকৌশল বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘খাদ্য, জ্বালানি ও পানির নিরাপত্তায় টেকসই সমাধানে কৃষিবিদ্যুতের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

কৃষি কৌশল বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী মোঃ বেলাল সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মাওলা। বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম মাওলা স্বাগত বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য ও অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি প্রকৌশলী হাসান জাফির তুহিন, আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) সদস্য-সচিব প্রকৌশলী শোয়েব বাশরি হাবলু এবং এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) সদস্য-সচিব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সচিব প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বিপ্লব।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের জৈব ও কৃষি প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রকৌশলী মো. শামীম আহমেদ, পিএইচডি।

একই জমিতে কৃষি ও বিদ্যুৎ

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষিবিদ্যুৎ একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। একই জমিতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ ধরনের ব্যবস্থায় কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সেচে বিদ্যুৎ খরচ, পানির ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিবিদ্যুতের সফল প্রয়োগ হয়েছে। চীনে বড় পরিসরে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি জমির ব্যবহার অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

বরেন্দ্রে পাইলট প্রকল্পের প্রস্তাব

বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে বিএমডিএর সেচ প্রকল্পসহ সংশ্লিষ্ট কৃষি ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন এলাকায় কৃষিবিদ্যুতের পাইলট প্রকল্প নেওয়ার সুপারিশ করেন বক্তারা।

তাদের মতে, পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে একই জমিতে ফসল উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ ব্যয়, পানির ব্যবহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল যাচাই করা যাবে।

এ ধরনের প্রকল্প সফল হলে কৃষক, উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাত কৃষিবিদ্যুৎ প্রযুক্তি গ্রহণে আরও উৎসাহিত হবে। পরে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বক্তারা।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কৃষিজমি সংরক্ষণের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিবিদ্যুৎ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একই জমির বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, খাদ্য উৎপাদনের জমি নষ্ট না করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব।

পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এবং সেচ ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও এ প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সেমিনারে উঠে আসে।

বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

বক্তারা বলেন, সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু আলোচনা বা গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রবন্ধকারের প্রস্তাবিত প্রযুক্তি ও ধারণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, পাইলট প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিবিদ্যুতের অর্থনৈতিক, কৃষি ও পরিবেশগত সম্ভাবনা নিরূপণ করে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের পথ তৈরি করা যেতে পারে।
//ডিবিটেক/এসআইআইবি/এসএমই/এমআইএস//