এআই সহিংসতায় নারীর নিরাপত্তা নিয়ে ঢাকা সংলাপ
এআই-নির্ভর সহিংসতা মোকাবিলায় আইন, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ ঘোষণা
- বাংলাদেশে ৮৯ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার
- এআই-নির্ভর হয়রানি ঠেকাতে আইন ও প্রযুক্তি সমন্বয়ের উদ্যোগ
- ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তায় হেল্পলাইন ও সংকটকেন্দ্র শক্তিশালী করা হচ্ছে
ঢাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় আইন, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন সহিংসতার শিকার নারীদের দ্রুত সহায়তা, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি-ভিডিও শনাক্ত ও অপসারণ এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম অধিবেশনটি পরিচালনা করেন।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, এআই-নির্ভর সহিংসতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ‘ঢাকা সংলাপ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০ এপ্রিল ২০২৬ আফ্রিকার শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে অনুষ্ঠিত দশম ডাকার আন্তর্জাতিক ফোরামে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো অনলাইন ও এআই-নির্ভর সহিংসতার সংজ্ঞা, রাজনৈতিক মনোযোগ, আইন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্য-প্রমাণ এবং অংশীদারত্বের ঘাটতি কমানো।
সংলাপের আওতায় রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রতিরোধ, তদন্ত ও প্রতিকার বিষয়ে অভিন্ন ভাষা, মানদণ্ড ও স্বেচ্ছামূলক নির্দেশনা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার অভিন্ন সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাস, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা, কৃত্রিমভাবে তৈরি উপাদানের পরিচয় ও উৎস যাচাই এবং জবাবদিহির মানদণ্ড তৈরির কথা বলা হয়েছে।
নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও রাজনৈতিক নেতাদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, পুলিশ-প্রসিকিউটর-বিচারকদের ডিজিটাল প্রমাণ ও এআই ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীদের সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ, গোপনীয়তা ও সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃত্রিম উপাদান শনাক্ত ও অপসারণের প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া সরকার, জাতিসংঘের সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ভুক্তভোগীদের নেটওয়ার্ককে যুক্ত করে এআই নির্মাতা ও প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা-ভিত্তিক নকশার স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতি নেওয়া এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংলাপে পাঁচজন বক্তা বক্তব্য দেন। এদের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ঢাকা সংলাপ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে নারীদের দৈনন্দিন অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
সমাজকল্যাণবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল অনলাইন সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও ভুক্তভোগী সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এআই-নির্ভর সহিংসতার তদন্ত ও বিচারে বিদ্যমান আইন ও প্রমাণসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা কণ্ঠস্বরের কারণে ক্ষতির প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জটিলতার বিষয়টি উঠে আসে।
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী বলেন, ক্ষতি হওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিবর্তে শুরু থেকেই প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিমভাবে তৈরি উপাদান সম্পর্কে স্বচ্ছতাকেও তিনি মৌলিক প্রত্যাশা হিসেবে উল্লেখ করেন।
মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলী নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনলাইন ও এআই-নির্ভর সহিংসতার শিকারদের সহায়তার যোগসূত্র তুলে ধরেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানানোর পর থেকেই যেন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশ্বাস করে এবং এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে না হয়—এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় আইনগত ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, কৃত্রিমভাবে তৈরি উপাদান ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দেশে ভুক্তভোগীদের সহায়তা ব্যবস্থার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশেও অনলাইন সহিংসতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় বহু-খাতভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় ১৪টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ৬৭টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল, একটি জাতীয় ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার এবং আটটি বিভাগীয় ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
২০২৫ সালে শুরু হওয়া দ্রুত সাড়াদানকারী দল প্রকল্পের মাধ্যমে এই কাঠামো ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই স্থানে চিকিৎসা, পুলিশি সহায়তা, আইনি সহায়তা, মানসিক-সামাজিক পরামর্শ ও আশ্রয়ের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর সহিংসতাকেও এ উদ্যোগের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে।
জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ নারীর জন্য দেশের সবচেয়ে বড় বিনামূল্যের ২৪ ঘণ্টার যোগাযোগকেন্দ্র। এতে অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, সম্মতিহীন ছবি, পরিচয় জালিয়াতি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ আসে। দ্রুত সাড়াদানকারী দল প্রকল্পের মাধ্যমে এসব অভিযোগ শুধু নথিভুক্ত না করে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
নারী বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের অবকাঠামো রয়েছে। এই বিদ্যমান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অনলাইন নিরাপত্তা, সম্মতি ও ডিজিটাল অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কোনো ঘটনায় অনলাইন উপাদান অপসারণ বা তদন্ত প্রয়োজন হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নারী বিষয়ক কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীদের পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিট এবং বিটিআরসির কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেন। মন্ত্রণালয় নিজে সাইবার অপরাধ তদন্ত না করলেও ভুক্তভোগীকে যেন একা এই প্রক্রিয়া মোকাবিলা করতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং, ই-শাসন এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি অনলাইনে নিরাপত্তার জন্য সবসময় সতর্ক থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই ডিজিটাল অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পায় না।
পরবর্তী ধাপে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহী সদস্যরাষ্ট্রগুলোর একটি প্রাথমিক দলকে ‘ঢাকা সংলাপের বন্ধু’ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেবে। অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড নিয়ে প্রথম একটি নির্দেশনামূলক নথি তৈরিতে কারিগরি কর্মদল গঠন করা হবে, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
//ডিবিটেক/এসএমএফ/এমআইএস/এসএমপিটি//





