গাড়ি ও জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী; বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় নজর
- পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা
- গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি আগ্রহ
- প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ
জাপানের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনার সম্ভাবনা, গাড়ি উৎপাদনশিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের টোকিও সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরের প্রথম দিন সোমবার সকালে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার উপস্থিতি এবং দুই দেশের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতার সম্ভাবনা সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এই সফরে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর। বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণা প্রকাশের কথা রয়েছে। জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেইয়ের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ওই ঘোষণায় বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার বিষয়টি উল্লেখ থাকতে পারে। তবে রয়টার্স প্রতিবেদনটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগের অঙ্ক ও খাতগুলোকে এখনই চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গাড়ি ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
নিক্কেইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বড় অংশ গাড়ি ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্প এবং জ্বালানি স্থাপনা নির্মাণে যেতে পারে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি কোম্পানির প্রবেশও এ উদ্যোগের অংশ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তোলার সঙ্গে জাপানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ একাধিক পক্ষ যুক্ত রয়েছে।
এ ধরনের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পে নতুন সক্ষমতা তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কত বিনিয়োগ করবে, প্রকল্পের অবস্থান কী হবে এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি কেমন হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়নও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সফরের শুরুতেই রেহান আসিফ আসাদের উপস্থিতি
২৬ অক্টোবর, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৭ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। অভ্যর্থনাপর্বে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. মো. শাকিরুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীকে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে তিনি ও তাঁর সফরসঙ্গীরা সেখানে অবস্থান করবেন।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে রেহান আসিফ আসাদের সফরে অংশগ্রহণের তাৎপর্য রয়েছে দুই দেশের প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও বিনিয়োগ সহযোগিতার আলোচনার ক্ষেত্রেও। সফরসূচিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।
জাপানে বাংলাদেশি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণও এ প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জাপানের বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং বেসিসের জাপান ডেস্ককে দুই দেশের প্রযুক্তি ব্যবসার যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সফরে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা ঘোষণা হয়েছে—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
শীর্ষ বৈঠক ও সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে মঙ্গলবার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা। বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হবে। এতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রত্যাশা রয়েছে। কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি দক্ষতা, বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। জ্বালানি সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তর নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা।
প্রধানমন্ত্রী জাপানের সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তার কর্মসূচিতে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক। এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিনিধি দলে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারকেরা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ ছাড়া রয়েছেন টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তারেক রহমানের তৃতীয় রাষ্ট্রীয় সফর। এর আগে তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি নিউইয়র্ক সফর করেছিলেন।
দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার জাপান
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।
স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা এ সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
টোকিও সফরের আলোচনায় সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, গাড়ি ও জ্বালানি খাতের প্রকল্প এবং প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়গুলো কীভাবে যৌথ ঘোষণায় স্থান পায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, সমঝোতা স্মারকগুলোর সুনির্দিষ্ট শর্ত এবং দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের ধরনই শেষ পর্যন্ত এ সফরের অর্থনৈতিক ফলাফল নির্ধারণ করবে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), রয়টার্স এবং নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনের বরাত।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//





