বাকৃবি’র উদ্ভাবনে সেন্সরে নিয়ন্ত্রণ হবে পরিবেশ
আইওটিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ক্ষতি কমবে ১৬ শতাংশ!
- বাকৃবির আইওটি প্রযুক্তিতে সংরক্ষণ ক্ষতি ১৫–১৬ শতাংশে নামার সম্ভাবনা
- সেন্সরে তাপমাত্রা-আর্দ্রতা মেপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে বাতাস
- মাঠপর্যায়ে পাইলট প্রয়োগের লক্ষ্য আগামী এক–দুই বছরে
পেঁয়াজ সংরক্ষণে পচন, ওজন হ্রাস, অঙ্কুরোদগম ও গুণগত মানের অবনতি কমাতে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও সেন্সরনির্ভর আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে পাওয়া ফলাফলে দেখা গেছে, প্রচলিত সংরক্ষণব্যবস্থায় যেখানে পেঁয়াজের ক্ষতি প্রায় ৩০–৩২ শতাংশ হতে পারে, সেখানে নতুন প্রযুক্তিতে তা প্রায় ১৫–১৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
তুলনামূলক কম খরচে এমন একটি স্মার্ট সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে সংরক্ষণকক্ষের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা সেন্সরের মাধ্যমে নিয়মিত পরিমাপ করা হবে। পরিবেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবর্তন দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এর মাধ্যমে পেঁয়াজ দীর্ঘসময় সংরক্ষণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন গবেষকরা।
গবেষণাটির নেতৃত্বে রয়েছেন বাকৃবির আইসিটি সেলের পরিচালক এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী। গবেষক দলে রয়েছেন সহকারী গবেষক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম এবং স্নাতক শিক্ষার্থী রাহাত মিয়া। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে ২০২৫ সালের মার্চে শুরু হওয়া গবেষণাটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক ও তথ্য বিশ্লেষণ পর্যায়ে রয়েছে।
উদ্ভাবনটির বিষয়ে ডিজিবাংলাটেক ডটনিউজের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী জানান, তুলনামূলক কম খরচে এমন একটি আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরিই গবেষণার মূল লক্ষ্য, যেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণের পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। দীর্ঘসময় পেঁয়াজের মান ধরে রাখতে তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব পরিবেশগত পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পচন, ওজন হ্রাসসহ অন্যান্য সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
গবেষকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংরক্ষণব্যবস্থার ভেতরে সেন্সর স্থাপন করে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংরক্ষিত পেঁয়াজের চারপাশের পরিবেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবর্তন শনাক্ত হলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। প্রযুক্তিটির নকশায় এয়ারফ্লো বা বাতাস চলাচল ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান চালু বা বন্ধ করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর সংরক্ষণকক্ষ পরীক্ষা করার পরিবর্তে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে করা সম্ভব হবে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, পেঁয়াজের জন্য উপযোগী তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রেখে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, পচন ও ওজন কমার মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা।
গবেষণায় শুধু পেঁয়াজ কতদিন ভালো থাকছে তা নয়, সংরক্ষণকালীন ওজন হ্রাস, পচনের হার এবং গুণগত মানের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে পাওয়া তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তুলনার মাধ্যমে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত পাওয়া পরীক্ষামূলক ফলাফল আশাব্যঞ্জক। প্রচলিত সংরক্ষণব্যবস্থায় ৩০–৩২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির তুলনায় আইওটি ও সেন্সরভিত্তিক ব্যবস্থায় ক্ষতি প্রায় ১৫–১৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে গবেষকরা এটিকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখছেন না; বৃহত্তর পরিসরে পরীক্ষা ও তথ্য বিশ্লেষণের পর প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও নিশ্চিত করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৫ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪২ দশমিক ৬৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। এরপরও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
অধ্যাপক ড. রোস্তম আলীর মতে, উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে কৃষককে অনেক সময় ফসল তোলার পরপরই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। ফলে মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে কম দামে বিক্রি করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক কিছুদিন পেঁয়াজ ধরে রেখে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি। এতে বছরজুড়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি কৃষকের আর্থিক ক্ষতিও কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষকের ভাষায়, এই প্রযুক্তির লক্ষ্য পেঁয়াজের ফলন বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ে অপচয় কমিয়ে কৃষকের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমানো গেলে বাজারে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণাটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পরীক্ষামূলক ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করার কাজ চলছে। পরবর্তী ধাপে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তব সংরক্ষণ পরিবেশে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণকেন্দ্রে পাইলট পর্যায়ে প্রযুক্তিটির প্রয়োগ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। অধ্যাপক ড. রোস্তম আলীর মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আধুনিক সেন্সর, তথ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী একটি পাইলট মডেল তৈরি করা সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা পাওয়া গেলে সফল মডেলটি পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলেও জানান তিনি।
গবেষকদের প্রত্যাশা, বৃহত্তর পরিসরের পরীক্ষায় প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত হলে তুলনামূলক কম খরচে কার্যকর স্মার্ট পেঁয়াজ সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমার পাশাপাশি কৃষক উপযুক্ত সময়ে পেঁয়াজ বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতেও এই কৃষিপ্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে।
//ডিবিটেক/ডিআরএসি/এসএমই/এমআইএস//





