বিটিসিএল ফাইভজি প্রজেক্ট: 

অন-সাইট টেস্ট রিপোর্টে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার

বিটিসিএলের ৩০০ কোটি টাকার ফাইভজি রেডি ডব্লিওডিএম (DWDM) প্রকল্পের যন্ত্রপাতি মূল্যায়ন দেশে অন-সাইট টেস্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে এবং নির্বাচিত সরকার এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। ভেন্ডরের খরচে বিদেশ ভ্রমণ বাতিল করে বুয়েট ও ঢাবির অধ্যাপকদের দিয়ে গঠিত কমিটি এই টেস্ট সম্পন্ন করে। রি-টেন্ডার করলে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রের দ্বিগুণ খরচ হতো বিধায় এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলেই ইরিভার্সিবল এলসি সম্পন্ন হওয়ায় প্রজেক্টটি এগিয়ে নেওয়া হয়। &

অন-সাইট টেস্ট রিপোর্টে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার
১০ জুন, ২০২৬ ২০:৩৪  
১০ জুন, ২০২৬ ২৩:১০  

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ফাইভজি রেডিনেস (DWDM) প্রকল্পের যন্ত্রপাতি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ করে গেছে  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন অন-সাইট টেস্ট রিপোর্টের ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে নির্বাচিত সরকার।

এ বিষয়ে উত্থাপিত বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে  ১০ জুন, বুধবার এমনটাই জানিয়েছেন  অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

তিনি জানান, ভেন্ডরের অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিটিসিএল কর্মকর্তারা ফ্যাক্টরি এক্সেপ্টেন্স টেস্টের (FAT) জন্য বিদেশে যেতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে, টেন্ডার স্পেসিফিকেশনের বিকল্প ধারা অনুযায়ী বুয়েটের ৩ জন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন অধ্যাপকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম ট্রান্সমিশন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের যন্ত্রপাতি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির নির্দেশনা ও রিপোর্টের ভিত্তিতেই অন-সাইট টেস্টিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে আনার (জাহাজীকরণ) অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে একটি পক্ষের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব স্পষ্ট করেন, ভেন্ডরের পক্ষ থেকে ফ্যাক্টরি টেস্টের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচিত নতুন সরকার চাইলে পরবর্তীতে সেই অর্থ ব্যবহার করে নতুন করে ফ্যাক্টরি ভিজিট করতে পারবে।

প্রজেক্টটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যমানের এই দরপত্র মূল্যায়ন, অফার এবং ব্যাংকে অফেরতযোগ্য ঋণপত্র (ইরিভার্সিবল এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। উক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা (L1) নির্বাচিত হয়। এর চেয়ে ৯০ কোটি টাকা বেশি দর দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জেডটিই (ZTE) এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকা বেশি দর দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল নোকিয়া (Nokia)। টেলিকম ট্রান্সমিশন খাতে হুয়াওয়ের 'ওএসএন ৯৮০০' (OSN 9800) সিরিজটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ইকুইপমেন্ট হিসেবে স্বীকৃত এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মোবাইল অপারেটর ও বিটিসিএলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোও এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

প্রকল্পটি পুনঃদরপত্র (রি-টেন্ডার) না করে চলমান রাখার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বিশেষ সহকারী জানান, পূর্বে ডলারের বিনিময় হার যখন ৮২ টাকার ঘরে ছিল, তখনই সর্বোচ্চ দরদাতার অফার ছিল ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে রি-টেন্ডার করলে রাষ্ট্রের দ্বিগুণ খরচ হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকেরা কারিগরি সক্ষমতা ও যন্ত্রপাতির মান সঠিক আছে বলে মতামত দেওয়ায় এবং আওয়ামী লীগের আমলেই ৩০০ কোটি টাকার এলসি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় জনস্বার্থে ও রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয়ে টেস্টিং প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, এই সংযোগের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত বিটিসিএলের অন্য একটি আইপি প্রকল্পের ২৭০ কোটি টাকার কাজ কানেক্টিভিটির অভাবে শেষ হয়ে বসে আছে। দেশের বৃহত্তম আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক থাকার পরও বিটিসিএলের মার্কেট শেয়ার মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে; এই কাজটি থমকে গেলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তির দৌড়ে আরও পিছিয়ে পড়ত। এমনকি ডিজিএফআই-এর সাবেক যে কর্মকর্তা শুরুতে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি দিয়েছিলেন, তিনিও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তীতে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক মত দেন।

ব্যক্তিগত সততা ও সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে ওঠা অপপ্রচারের জবাবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দৃঢ়তার সাথে বলেন, তিনি এই কেস বা অন্য কোনো কেসে কারও কাছ থেকে কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা বা ঘুষ নেননি। দেশ-বিদেশের যেকোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাইয়ের জন্য তিনি উন্মুক্ত। তাঁর চীন সফরটি ছিল মূলত 'চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন'-এর আমন্ত্রণে, যাদের বাংলাদেশে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের সরাসরি বিনিয়োগ রয়েছে। সফরকালে তিনি বিশ্বখ্যাত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং চীনের আইসিটি খাতের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল প্রতিষ্ঠান 'সিএআইসিটি' (CAICT)-তে সিটি অটোমেশন মাস্টারপ্ল্যান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ৫টি টেকনিক্যাল সেশনে অংশ নেন। এই অভিজ্ঞতা দেশের আইসিটি খাতের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তৈরিতে কাজে লেগেছে।

ডিজিবাংলাকে তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই প্রকল্পে অনিয়মের সূত্রপাত করেছিলেন বিগত সরকারের সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, যিনি বিটিসিএল বোর্ডকে দিয়ে কিছু ভুয়া পেপারওয়ার্ক তৈরি করে ৯০ কোটি টাকা বেশি দরের জেডটিই কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—যা তৎকালীন সরকারি ক্রয় কমিটিই খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সম্পাদকের আত্মীয় মুশফিক আনামও রি-টেন্ডার করিয়ে নিজের কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা ছিল না, কোনো অর্থ ছাড় বা জমাও তাঁর সময়ে হয়নি। দেশের দুই শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন সম্মানিত অধ্যাপক এবং সৎ কর্মকর্তাদের এই প্রকল্পের উছিলায় অহেতুক হয়রানি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের মুখোমুখি করায় তিনি তীব্র নিন্দা জানান। এই মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশন না থাকা সত্ত্বেও ঠিক কারা অন্তর্বর্তী সরকারের একজন সদস্য এবং শিক্ষাবিদদের হেনস্তা করছে, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি প্রয়োজনে এই হয়রানির বিরুদ্ধে নিজেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

//ডিবিটেক/এমএআর/ইকে//