ইউটিউব প্রিমিয়ামের মূল্য যেভাবে উসুল করবেন

ইউটিউব প্রিমিয়ামের মূল্য যেভাবে উসুল করবেন
৮ জুন, ২০২৬ ১৭:০২  

ইউটিউব প্রিমিয়াম সেবাটি নেওয়া আসলেই কি বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি কেবল বিজ্ঞাপন এড়াতে বাড়তি টাকা নষ্ট—এই নিয়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মাঝে তর্ক বহু পুরোনো। বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে যখন গুগল বিশ্বব্যাপী ইউটিউব প্রিমিয়ামের সাবস্ক্রিপশন ফি আরও এক দফা বাড়িয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৬ ডলারে (ফুল-ফ্যাট সংস্করণ) নিয়ে গেল, তখন এই আলোচনা নতুন করে গতি পায়। অনেকে হয়তো শুধু ভিডিওর শুরুতে বা মাঝখানে বিরক্তিকর সব ওয়ানএক্সবেট বা ভিপিএন-এর বিজ্ঞাপন এড়াতে এই সাবস্ক্রিপশন কেনেন। কিন্তু আপনি যদি এর সাথে থাকা অন্যান্য দারুণ সব ফিচারের শতভাগ ব্যবহার না করেন, তবে আপনার কষ্টের টাকা পুরোপুরি উসুল হচ্ছে না।

আপনার পেইড সাবস্ক্রিপশনের মূল্য কীভাবে সর্বোচ্চ মাত্রায় উসুল করবেন, তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বিভিন্ন গ্যাজেট ও সার্ভিসের সাথে ‘ফ্রি বান্ডেল’ খুঁজুন
আপনি যদি একটি নতুন স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা মোবাইল কানেকশন নেওয়ার কথা ভেবে থাকেন, তবে আগে দেখে নিন সেখানে ইউটিউব প্রিমিয়ামের কোনো ফ্রি অফার বা ক্রেডিট রয়েছে কিনা। বিশ্বের অনেক প্রযুক্তি ও টেলিকম প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন ডিভাইসের সাথে কয়েক মাসের জন্য ইউটিউব প্রিমিয়াম সম্পূর্ণ ফ্রি দিয়ে থাকে।

যেমন—বর্তমানে গুগল তাদের নতুন ‘পিক্সেল ১০এ’ স্মার্টফোনের সাথে ৩ মাসের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন বিনামূল্যে দিচ্ছে। আবার গুগলের নিজস্ব সেলুলার নেটওয়ার্ক ‘গুগল ফাই’-এর আনলিমিটেড প্যাকের সাথে মিলছে টানা ৬ মাসের ফ্রি ইউটিউব প্রিমিয়াম। আগে স্যামসাং গ্যাজেট কিনলেও এক বছরের ফ্রি অফার পাওয়া যেত। এই ফ্রি ট্রায়ালগুলো শেষ হওয়ার আগে বাতিল করে দিলে কোনো জরিমানা কাটে না। আর যদি আপনি নিয়মিত ব্যবহারকারীও হন, তবে বছরের ৩ থেকে ৬ মাস ফ্রিতে পাওয়া মানে পুরো বছরের খরচ অর্ধেক বা তারও বেশি কমিয়ে আনা।

২. ‘ইউটিউব মিউজিক’-কে অবহেলা নয়
ইউটিউব প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার সাথে সাথেই আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ইউটিউব মিউজিক’-এর প্রিমিয়াম অ্যাক্সেস পেয়ে যাচ্ছেন। অথচ অনেক ব্যবহারকারী এই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিক-এর জন্য আলাদাভাবে প্রতি মাসে টাকা খরচ করেন। যদি আপনি স্পটিফাইয়ের কড়া ভক্ত না হন, তবে সেই সাবস্ক্রিপশনটি বাতিল করে সরাসরি ইউটিউব মিউজিক ব্যবহার শুরু করতে পারেন।

গুগলের এই মিউজিক অ্যাপটির অ্যালগরিদম অত্যন্ত শক্তিশালী। ইউটিউবে আপনার গান শোনার পুরোনো ইতিহাস অ্যানালাইসিস করে এটি চমৎকার সব অটোমেটিক প্লে-লিস্ট ও মিক্স তৈরি করে, যা আপনাকে অনেক পুরোনো বা নতুন গান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া আপনার কম্পিউটারে যদি নিজস্ব কোনো অডিও ফাইলের কালেকশন থাকে, তবে ব্রাউজার থেকে সরাসরি ড্র্যাগ অ্যান্ড ড্রপ করে তা ইউটিউব মিউজিকের ক্লাউড লাইব্রেরিতে আপলোড করে যেকোনো ডিভাইস থেকে শুনতে পারবেন। এটি গুগল হোম, অ্যান্ড্রয়েড অটো এবং জেমিলাই এআই-এর সাথেও চমৎকারভাবে ইন্টিগ্রেটেড।

৩. অফলাইন ডাউনলোডের সঠিক ব্যবহার
আপনি যদি ঘন ঘন বিমানে যাতায়াত করেন, সাবওয়ে বা মেট্রো রেলে যাতায়াত করেন কিংবা এমন কোনো এলাকায় থাকেন যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, তবে ইউটিউবের অফলাইন ডাউনলোড ফিচারটি আপনার জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ।

ওয়াইফাই বা ৪জি/৫জি নেটওয়ার্কে থাকা অবস্থায় যেকোনো বড় ভিডিও বা পডকাস্টের পাশের থ্রি-ডট মেনু থেকে তা ডাউনলোড করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়াই অ্যাপের ‘ইউ’ ট্যাব থেকে ‘ডাউনলোডস’ সেকশনে গিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা দেখা যাবে। তবে এর একটি সাব-ফিচার হলো ‘স্মার্ট ডাউনলোডস’, যা ওয়াইফাই পেলেই আপনার পছন্দের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও ডাউনলোড করে স্টোরেজ ও ব্যাটারি খরচ করে। এই ডাউনলোডগুলো সর্বোচ্চ ১০৮০পি রেজোলিউশনে সীমাবদ্ধ হওয়ায় যাদের ১৪৪০পি বা ৪কে ডিসপ্লে রয়েছে, তাদের একটু বিরক্ত লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে অ্যাপের সেটিংসের ডাউনলোড অপশনে গিয়ে এই স্মার্ট ডাউনলোড ফিচারটি বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয়।

৪. ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে: স্ক্রিন বন্ধ রেখেও শুনুন পডকাস্ট
ইউটিউব প্রিমিয়ামের অন্যতম সেরা এবং কাজের ফিচার হলো ‘ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে’। সাধারণ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ইউটিউব অ্যাপ থেকে বের হওয়া মাত্রই ভিডিও বন্ধ হয়ে যায়। আগে ক্রোম বা অন্য ব্রাউজারে ডেস্কটপ মোড করে এটি চালানো গেলেও গুগল চলতি বছরের শুরুতে সেই লুপহোল বা চতুর উপায়টি বন্ধ করে দিয়েছে।

প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা যেকোনো ভিডিও চালু করে ফোন লক করে পকেটে রেখে দিলে কিংবা অন্য কোনো অ্যাপ (যেমন ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ) ব্যবহার করলেও ব্যাকগ্রাউন্ডে অডিওটি চলতে থাকবে। যারা মূলত রান্নার সময়, জগিং বা সাইক্লিং করার সময় পডকাস্ট বা টকশো শোনেন—ভিডিও দেখার প্রয়োজন হয় না, তাদের জন্য এটি দারুণ কার্যকর। তবে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা মনে রাখবেন, ব্যাকগ্রাউন্ডে ইউটিউব অ্যাপ অনেক বেশি ব্যাটারি টানে বলে অনেক সময় ফোনের ওএস স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসেসটি কিল বা বন্ধ করে দিতে পারে; সে ক্ষেত্রে অ্যাপটি আবার ওপেন করে প্লে চাপতে হয়। (ফ্রি ব্যবহারকারীদের জন্য এখন কেবল ‘পিকচার-ইন-পিকচার’ বা ছোট উইন্ডো মোডটি চালু রয়েছে, তবে স্ক্রিন বন্ধ করলে সেটিও কাজ করে না)।

৫. এক্সপেরিমেন্টাল ও এআই ফিচারের আগাম স্বাদ
প্রিমিয়াম গ্রাহকেরা ইউটিউবের যেকোনো নতুন বেটা বা পরীক্ষামূলক ফিচার সবার আগে ব্যবহারের সুযোগ পান। বর্তমানে এই ফিচারগুলোর বেশিরভাগই এআই-চালিত। যেমন—গুগলের জেমিলাই এআই মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘আস্ক ইউটিউব’ সার্চ মোড, যা দিয়ে ভিডিওর ভেতরেই এআই-কে বিভিন্ন প্রশ্ন করা যায়।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে যোগ হওয়া ‘অটো স্পিড’ ফিচারটি একটি গেম-চেইঞ্জার। এটি বড় ভিডিওগুলোর প্লেব্যাক স্পিড ঢালাওভাবে না বাড়িয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে সামঞ্জস্য করে। অর্থাৎ, ভিডিওতে কেউ যখন খুব ধীরগতিতে কথা বলবে তখন স্পিড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়িয়ে দেবে, আবার যখন কোনো জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে তখন স্পিড স্বাভাবিক করে দেবে। (তাছাড়া প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা সর্বোচ্চ ৩.০এক্স পর্যন্ত স্পিড বাড়ানোর সূক্ষ্ম স্লাইডার কন্ট্রোলও পান)।

সবচেয়ে দরকারি আরেকটি ফিচার হলো ‘জাম্প অ্যাহেড’ বাটন। ভিডিও স্কিপ করার জন্য স্ক্রিনে ডাবল ট্যাপ করলেই ডানদিকের নিচে এই বাটনটি ভেসে ওঠে। এটিতে চাপ দিলে ভিডিওর সেই অংশে সরাসরি নিয়ে যায়, যেখানে বেশিরভাগ দর্শক স্কিপ করে চলে গেছেন। এর ফলে ভিডিওর ভেতরে থাকা বিভিন্ন স্পনসরড বা বিজ্ঞাপনী অংশ মুহূর্তেই এড়ানো সম্ভব হয়, যা আপনার দেখার অভিজ্ঞতাকে করে তোলে একদম নিখুঁত।

উচ্চ বিটরেট এবং হাই-ফিডেলিটি অডিওর মতো ছোট ছোট কোয়ালিটি লাইফ ইম্প্রুভমেন্টগুলো একবার ব্যবহারের অভ্যাস হয়ে গেলে সাধারণ ইউটিউবে ফিরে যাওয়া কঠিন। তাই প্রতি মাসে প্রিমিয়ামের জন্য যে টাকা দিচ্ছেন, তা উসুল করতে আজই এই সেটিংস ও ফিচারগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

ডিবিটেক/বিএমটি   ।   সূত্র: এনগ্যাজেট