জাতীয় সোর্স কোড নীতিমালা ২০২৫:
ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সরকারি অর্থে নির্মিত সফটওয়্যারকে “জাতীয় সম্পদ” হিসেবে ঘোষণা করার পথে বড় এক পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় সোর্স কোড নীতিমালা ২০২৫ (খসড়া)—কেবল প্রযুক্তিগত নির্দেশনা নয়, বরং বাংলাদেশের ডিজিটাল শাসনপদ্ধতির এক নতুন যুগের ঘোষণা। নীতির মূলমন্ত্র “জনগণের অর্থ, জনসাধারণের কোড (Public Money, Public Code)”—ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এস্তোনিয়া, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর ওপেন সোর্স নীতিকে অনুসরণ করে। এতে স্পষ্ট—বাংলাদেশ বিশ্বমানের ডিজিটাল গভর্নেন্স কাঠামোয় নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে প্রস্তুত।
জাতীয় সম্পদের সংজ্ঞা নতুন করে লিখছে নীতি
খসড়ায় বলা হয়েছে—সরকারি অর্থে তৈরি বা সরকার–নিয়ন্ত্রিত সব সফটওয়্যারই জাতীয় সম্পদ। এগুলো সংরক্ষিত থাকবে কেন্দ্রীয় রিপোজিটরিতে; তালিকাভুক্ত না হলে কোনো সফটওয়্যার প্রোডাকশনে চালু করা যাবে না। বাংলাদেশে বহু বছরের পুরোনো সমস্যা— “প্রকল্প শেষ, প্রতিষ্ঠান চলে গেছে, সোর্স কোড নেই”— এ নীতি কার্যকর হলে আর বৈধ থাকবে না।
এর ফলে সরকারি সফটওয়্যার আর কেবল একটি ফাইল নয়—জাতীয় অবকাঠামোর অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে।
পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক: অপচয় রোধ ও দক্ষতার নিশ্চিতকরণ
“Reuse First” নীতি সরকারি আইসিটি প্রকল্পে নতুন সংস্কৃতি তৈরি করবে—নতুন কোড লেখার আগে খুঁজতে হবে আগে তৈরি কোনো সমাধান আছে কি না।
এর সুফল—
- বারবার একই প্রকল্প বানানোর প্রবণতা কমবে,
- উন্নয়নের গতি বাড়বে,
- জনগণের অর্থ সাশ্রয় হবে।
উন্নত দেশগুলো বহু বছর ধরে পুনর্ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করেছে; বাংলাদেশও সেই ধারায় পা রাখছে—এটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
প্রযুক্তি-সেবা নির্ভরতা কমানো: রাষ্ট্র আর জিম্মি নয়
নীতিমালায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতা (vendor lock-in) ভাঙা। ভবিষ্যতে—
- সম্পূর্ণ সোর্স কোড,
- ডকুমেন্টেশন,
- আর্টিফ্যাক্ট
সবই জমা দিতে হবে কেন্দ্রীয় রিপোজিটরিতে। সফটওয়্যারের আইপি বা স্থায়ী ব্যবহারের অধিকার থাকবে সরকারের হাতে, কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো এসক্রো (Escrow) ব্যবস্থা—যেখানে কোড একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের কাছে সংরক্ষিত থাকে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও বা সেবা দিতে ব্যর্থ হলেও রাষ্ট্র কোড হারাবে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়, যেখানে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হয়ে পড়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ডিজিটাল স্বাধীনতার জন্য শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠবে।
ওপেন কোড: স্বচ্ছতা, তবে যুক্তিযুক্ত অব্যাহতি
নীতির মূল দর্শন হলো—সরকারি কোড ডিফল্টভাবে উন্মুক্ত থাকবে, তবে জাতীয় নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও তৃতীয় পক্ষের মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে সীমিত অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে।
অব্যাহতি পেলেও কোড রিপোজিটরিতে থাকবে—“গোপন” মানে আর “অদৃশ্য” নয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তা বা গোপনীয়তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট হওয়া জরুরি—অন্যথায় স্বচ্ছতার বদলে ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে।
আধুনিক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং: নীতিমালার শক্ততম অংশ
এই অংশটি প্রমাণ করে—খসড়াটি কেবল ওপেন সোর্স নয়, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করছে। এতে রয়েছে—
- নিরাপদ কোডিং গাইডলাইন কমিটি
- বাধ্যতামূলক CI/CD পাইপলাইন: স্বয়ংক্রিয় টেস্ট, নিরাপত্তা স্ক্যান, লাইসেন্স যাচাই
- SBOM: সফটওয়্যার উপাদানের স্বচ্ছ তালিকা
- Role-Based Access Control
- মেশিন লার্নিং ডেটাসেটের নৈতিক ও কারিগরি নির্দেশনা
সংক্ষেপে— CI/CD সফটওয়্যার তৈরির পথকে নিরাপদ করে, আর SBOM সফটওয়্যারকে করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। এটি যুক্তরাষ্ট্রের CISA, ইউরোপের NIS-2 Directive এবং ভারতের Digital Public Goods নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা দেখায় বাংলাদেশ বিশ্বমান ধরে এগোচ্ছে।
আইনি সমন্বয়: সফলতার মূল শর্ত
নীতিটি জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশের অধীনে জারি হবে। তবে এর সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্টসহ ও প্রচলিত আইনের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। এই সমন্বয় ব্যর্থ হলে স্বচ্ছতা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে—যা নীতির মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে।
কারা লাভবান, কারা অস্বস্তিতে?
লাভবান—রাষ্ট্র ও নাগরিক।
অস্বস্তিতে—যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি কোডকে ব্যক্তিগত সম্পদ ভেবে এসেছে।
সরকারের ভেতরেও নতুন সংস্কৃতি গড়তে হবে—“নতুন বানানোর আগে পুরোনো কী আছে” তা খুঁজে দেখার অভ্যাস। এটি ডিজিটাল শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে।
শেষ কথা: এখন বাস্তবায়নের সময়
খসড়াটি আধুনিক, সাহসী ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত। কিন্তু মূল প্রশ্ন—এটি কি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে কার্যকর হবে? বাংলাদেশ কি সত্যিই “জনগণের অর্থ, জনগণের কোড” বাস্তবায়নের পথে এগোবে, নাকি কিছু কোড থেকে যাবে অদৃশ্য কয়েকটি হাতের দখলে?
যদি এ নীতি বাস্তবায়িত হয়—বাংলাদেশ কেবল সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনায় নয়, ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের নতুন যুগে প্রবেশ করবে।







