সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩- বাস্তবায়নে প্রয়োজন চারটি পৃথক ডিজিটাল আইন

তানভীর হাসান জোহা

সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩- বাস্তবায়নে প্রয়োজন চারটি পৃথক ডিজিটাল আইন
৯ জুন, ২০২৫ ১৩:৫৮  
৯ জুন, ২০২৫ ১৬:৩০  

সাইবার আকাশে বাংলাদেশের সুরক্ষায় ২০২৩ সালে প্রণীত হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা আইন। আইনটির মাধ্যমে প্রস্ফূটিত হয়েছে ডিজিটাল অপরাধ দমন এবং অনলাইন নিরাপত্তার একটি নতুন কাঠামো গড়ার ঘোষণা। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কেননা, এই আইনটি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। এটি মূলত অপরাধ দমনমূলক (punitive) ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণভিত্তিক একটি আইন। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা মানে কেবল সাইবার অপরাধ রোধ নয়; এর সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ডিজিটাল অধিকার, কনটেন্টের নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল অপরাধে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা। তাই নিচের লেখায় বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে  এই খাতে আমার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে করণীয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এক্ষেত্রে আইনটির শক্তি, দুর্বলতা, সুযোগ এবং হুমকি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করবো। 

কেননা, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এই নতুন আইনও ডিজিটাল জগতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। ফলে এই লেখাটি ২০২৩ সালে প্রণীত বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইন বিশ্লেষণ করে প্রস্তাব করছে কেন এখনো আলাদা ও বিষয়ভিত্তিক ডিজিটাল আইন প্রয়োজন। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতমুখী আইন প্রস্তাব করা।

সাইবার গোপনীয়তা ও অধিকার সংরক্ষণ আইন 

বিদ্যমান আইনগত ঘাটতি:
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ এ অননুমোদিত ডেটা প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও এটিতে ব্যক্তির তথ্য ব্যবস্থাপনার অধিকার, যেমন—ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও মুছে ফেলার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুপস্থিত।

প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য:
• ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা
• ব্যবহারকারীকে তার তথ্য দেখতে, সংশোধন করতে ও অপসারণ করতে দেওয়ার অধিকার
• রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নজরদারিকে বিচারিক অনুমোদনের আওতায় আনা
• একটি স্বাধীন ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন

অনলাইন কনটেন্ট দায়িত্ব আইন

বিদ্যমান সমস্যা:
মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা, চরিত্রহনন ও উসকানিমূলক কনটেন্টের বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কোনো নির্দিষ্ট দায় নির্ধারিত নেই। বর্তমানে এককভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ব্যবহারকারীকে অপরাধী করা হয়—প্ল্যাটফর্ম বা অ্যালগরিদমের ভূমিকা অনুচ্চারিত।

প্রস্তাবিত আইনের মূল বিষয়:
• সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কনটেন্ট হোস্টিং প্ল্যাটফর্মের জন্য ন্যূনতম দায়িত্ববোধ নির্ধারণ
• স্বচ্ছ কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়া ও আপিল ব্যবস্থা
• নির্বাচনী সময়ে অর্থায়িত পোস্টিং ও রাজনৈতিক প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ
• Content Tribunal গঠন করে ন্যায্য সমাধানের পথ তৈরি

সরকারি কেনাকাটায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নজরদারি আইন 

চ্যালেঞ্জ:
বর্তমান ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে দুর্নীতি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, রিয়েল-টাইম অডিট বা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রস্তাবিত আইনের প্রধান উদ্দেশ্য:
• AI-ভিত্তিক টেন্ডার বিশ্লেষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা
• সরকারি প্রকল্পের খরচ, সময়সীমা ও কার্যক্রম জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা
• অস্বাভাবিক বিলিং বা কার্টেলাইজেশন শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ব্যবস্থা
• নাগরিকদের সরাসরি নজরদারি অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা

ডিজিটাল অপরাধে ভুক্তভোগী সুরক্ষা আইন

বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা:
ভিকটিমদের রিপোর্টিং, মনোসামাজিক সেবা, আইনি সহায়তা কিংবা গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে কোনো পৃথক বিধান নেই।

প্রস্তাবিত আইনে যা থাকবে:
• নাম গোপন রেখে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ
• বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী ও শিশু বান্ধব সেল প্রতিটি থানায়
• আদালতের মাধ্যমে তড়িৎ কনটেন্ট অপসারণ আদেশের বিধান
• জরুরি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা
• সংবাদ মাধ্যমে দায়বদ্ধতার সঙ্গে রিপোর্টিং নিশ্চিত করতে নীতিমালা

কেন একটি আইন যথেষ্ট নয়?

একই আইনে সব সমস্যার সমাধান চাইলে তা জটিলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনি অকার্যকারিতা সৃষ্টি করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন আইন হলে—
• সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের স্পেশালাইজড অ্যাকাউন্টেবিলিটি তৈরি হয়
• আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা সহজ হয়
• আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হয়
• নাগরিকদের অধিকার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়

সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি, কিন্তু এটি পর্যাপ্ত নয়। কেননা আইনটি মূলত সাইবার নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধের উপর দৃষ্টিপাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই আইনে ডেটা গোপনীয়তা, ডিজিটাল গভর্নেন্স, ই-কমার্স এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ঘাটতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশ এখনো আলাদা ডিজিটাল আইন আবশ্যক।  যদি আমরা বাংলাদেশে বাস্তবিক অর্থেই  ডিজিটাল সুশাসন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং তথ্য-ভিত্তিক গণতন্ত্র চাই, তাহলে আলাদা চারটি আইন—প্রাইভেসি, কনটেন্ট, সরকারি স্বচ্ছতা ও ভিকটিম সুরক্ষা—প্রণয়ন করা সময়োপযোগী ও ন্যায্যতার প্রকাশ। আর এ কারণেই পৃথক আইনগুলো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।

লেখক: সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।