তৈরি হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং নীতিমালা ও জাতীয় ছক
ফ্রি-ল্যান্সারদের জন্য একটি সময়োপযোগী নীতিমালা প্রস্তুত করছে অন্তর্বর্তী সরকার। একইসঙ্গে জাতীয় সাইবার সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে গঠন করা হবে একটি জাতীয় ছক বা সাইবার অপারেশন সেন্টার। এছাড়াও আগের বিচ্ছিন্নভাবে ডিজিটাল রূপান্তরে করা উদ্যোগগুলো একীভূত করে জনকল্যাণে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে পূণর্জ্যিবিত করা হয়েছে বাংলাদেশের কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রকৌশলীদের তৈরি সুরক্ষা অ্যাপ। রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে নাগরিকবান্ধব ডিজিটাল সেবা দিতে রেগুলেটর, আবকাঠামো ও অ্যাপ্লিকেশনের সমন্বিত উন্নয়ন করা হচ্ছে।
২৫ অক্টোবর, শনিবার রাজধানীর মহাখালীর নূরানী টাওয়ারের ১২তলায় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “ব্রেইন স্টেশন ২৩ (Brain Station 23)” কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী সাইবার সিকিউরিটি সিম্পোজিয়ামের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য তুলে ধরেন আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।
এসব উদ্যোগের ফলে ‘অচিরেই ভালো ফল’ মিলবে বলে আশ্বাস দেন সচিব। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেই আমরা ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তায় একটি অধ্যাদেশ করেছি। এক্ষেত্রে ১৮টি কনসালটেশন হওয়ার পরও সব নাগরিকের মন্তব্য নিতে ৪৫ দিন সময় দেয়া হয়েছিলে। শিগগিরেই এটি আইন আকারে পাশ হবে।
শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে জাতীয় পর্যায়ে চলছে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন। প্রাথমিক রেগুলেটরি স্তরে ডাটা সিকুরিটি, সাইবার সিকুরিটি আইনসহ প্রণয়নসহ ন্যাশনাল ডাটা গভর্নেন্স অথরিটি গঠন করছে সরকার। দ্বিতীয় স্তরে বহুমাত্রিক ব্যাকবোন তৈরি; যেখানে গুরুত্ব পাবে ইন্টার অপেরাবিলিটি এবং ইন্টিগ্রেশন। সর্বশেষ পর্যায়ে দেশিয় জনবল এর উপযুক্ত ব্যাবহার এর মাধ্যমে তৈরি হবে উন্নতমানের সফটওয়্যার ও ডেভেলপমেন্ট আবহ। অদূর ভবিষ্যতেই ফ্রি-ল্যান্সারদের জন্য সময়োপযোগী নীতিমালা আসছে।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের অন্যতম প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ বাংলাদেশ সিস্টেম এডমিনিস্ট্রেটরস ফোরাম (বিডিসাফ) উদ্যোগে ৮৬টি আইটি ও টেলিকম প্রতিষ্ঠানের শতাধিক সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা যোগ দেন। বক্তব্যে আগামি দিনে বিডিসাফ এবং আইসিটি বিভাগের একসাথে কাজ করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন আইসিটি সচিব।
বিডিসাফ প্রেসিডেন্ট মোঃ জোবায়ের আল মাহমুদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিমের সঞ্চালনায় সম্মেলনের শেষ অধিবেশন “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতারণার দ্বন্দ্ব: তথ্য সুরক্ষার যুগে বাংলাদেশের সাইবার প্রতিরক্ষা পুনর্নির্মাণ” বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন এশিয়া-প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টার (এপনিক) এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল সদস্য সুমন আহমেদ সাবির, বরেণ্য তথ্য প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্যোক্তা শায়েরুল হক জোয়ার্দার নীল, মুঠোফোন অপারেটর রবি-এর সহযোগী পরিচালক সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাবিল আহমেদ খান।
অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বারক গ্রহণ করেন ব্রেইন স্টেশন ২৩ এর প্রধান নির্বাহী রাইসুল কবির।
এর আগে টেকনিক্যাল সেশনে আলোচনা করেন ইস্টার্ন ব্যাংকে পিএলসি-এর তথ্য নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান ন লিংক-থ্রি প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা রকিবুল হাসান, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ফোনের হেড অফ সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার রাসকিন পাল, সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিস্থান ব্রেইন স্টেশন ২৩ এর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ পুলিশের এসপি খালেদা বেগম, বাংলা লিংকের আইটি নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি অপারেশন প্রধান মেজর (অবঃ) এস এম আল মায়মুন, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এস এম রুবায়েত ইসলাম, মুঠো ফোন প্রতিষ্ঠান ন ররি-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সামিনুল ইসলাম তরফদার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেক নোভেল্টি লিমিটেড এর এ কে এম নুরুল আলাম এবং ব্রেইন স্টেশন ২৩ এর সলিউশন আর্কিটেক্ট আনোয়ার হোসাইন।
প্যানেল আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর হুমকি শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, অংশীদারদের মতামতের ভিত্তিতে তথ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ও নৈতিক ও স্বচ্ছ প্রযুক্তি ব্যবহারের নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। একইসঙ্গে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে সাইবার স্পেশ সুরক্ষা কারার পাশাপাশি জনপরিসরে সচেতনতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশ এরইমধ্যে আর্থিক খাত, টেলিকম ও সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে সাইবার প্রতিরক্ষা জোরদারের সুযোগ তৈরি করবে। তবে মানবিক দক্ষতা ও প্রযুক্তির ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, তেমনি ডিপফেইক, ভুয়া পরিচয় ও ডেটা ফাঁসের মতো নতুন সাইবার হুমকিও তৈরি করছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের এখন সময় এসেছে সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং তথ্য সুরক্ষা নীতিমালা আরও শক্তিশালী করার।
সকালে তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এস এম রুবায়েত ইসলামে আলোচনায় ছিল সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার আধুনিকায়নের খুঁটিনাটি এবং এবং থ্রেট হান্টিং বিষয়ে বিশদ আলোচনা। অপর একটি টেকনিক্যাল সেশনে সিস্টেম অ্যাডমিনেস্ট্রেটর এ কে এম নুরুল আলম আলোচনা করেন তথ্যপ্রযুক্তি কাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিকল্পনা এবং পরিচালনা নিয়ে। এছাড়াও রবি আজিয়েটার সামিনুল ইসলাম আলোকপাত করেন ক্লাউড অবকাঠামোর অংশীদারি ব্যবহার এবং নিরাপত্তা সীমানা নির্মাণ ও পরিচালনা বিষয়ে।
সিম্পোজিয়ামে বক্তারা বলেছেন, দেশে ও বিদেশে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণা ও সাইবার হামলার ঝুঁকি। বিশেষ করে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড চুরি, ফিশিং ও অত্যাধুনিক এআই-নির্ভর কৌশল এখন সাইবার অপরাধের নতুন হাতিয়ার। সাধারণত প্রতারকেরা ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট বা কোনো অনলাইন বিক্রেতা সেজে ফোন করে। তারা বিভিন্ন অজুহাতে যেমন অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়া, পুরস্কার জেতা বা সার্ভিস আপডেটের মতো বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে আপনার ওটিপি জানতে চায়। এ ছাড়া গ্রাহককে একটি ক্ষতিকারক লিংকে ক্লিক করতে প্রলুব্ধ করে প্রতারণা করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইস থেকে ওটিপি বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হচ্ছে। এতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ই-ওয়ালেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি করে বা ডেটা চুরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আলোচকদের মতে, সহজলভ্য ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ এখন অনলাইন প্রতারকদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রবেশের জন্য অপরিহার্য ওটিপি চুরি একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতারকেরা বিভিন্ন ফিশিং লিংক, ভুয়া কল বা টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ওটিপি হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সিম্পোজিয়ামের একাধিক কারিগরি অধিবেশনে ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগ খাতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, নেটওয়ার্ক, অ্যাপ্লিকেশন ও সিস্টেমে শক্তিশালী টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ করা যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই ধরনের প্রতারণা সম্পূর্ণভাবে ঠেকানো সম্ভব নয়।
দিনব্যাপী কারিগরি সেশনগুলোয় আলোচনায় ছিলেন গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, ব্রেইন স্টেশন ২৩, ইস্টার্ন ব্যাংক, বাংলাদেশ পুলিশসহ বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ পেশাজীবীরা। এদের মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের তথ্য নিরাপত্তা প্রধান আবুল কালাম আজাদ আলোচনা করেন বিভিন্ন টুলের সমন্বয়ের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ও সিস্টেম সুরক্ষা নিয়ে। গ্রামীণফোনের রাসকিন পাল তুলে ধরেন র্যানসমওয়্যার আক্রমণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল বিষয়ে। আর, ব্রেইন স্টেশন ২৩–এর মিজানুর রহমান ব্যাখ্যা করেন সফটওয়্যার নির্মাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটতে থাকা নানা ধরনের অপরাধ, তার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও আইনগত প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বাংলাদেশ পুলিশের এসপি খালেদা বেগম। ব্রেইন স্টেশন ২৩ এবং লিডিং এজ টেকনোলজির সহায়তায় আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিডিসাফ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আশফাকুর রহমান।



