যে কারণে ভোগান্তির শেষ নেই এটিএম বুথে
কোরবানি ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে রাজধানীতে ফিরেছেন কর্মজীবী মানুষ। কিন্তু ছুটির কারণে ১৩ জুন (শুক্রবার) যখন ব্যাংক বন্ধ তখন ব্যাংকের স্বয়ংক্রিয় টেলার মেশিন (এটিএম বুথ) থেকেও টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন গ্রাহকেরা। বুথগুলো খোলা থাকলেও অনেকগুলো থেকেই টাকা উত্তোলনের করা যাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও টাকার সংকটে বুথের শাটার নামানো, কোনোটির সামনে সাটিয়ে দেয়া হয়েছে ‘টাকা নেই’। ঈদের ছুটিতে দেশজুড়েই বুথে টাকার এমন সংকটাবস্থা আগে কখনো দেখেননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক গ্রাহকই।
এদিকে যেসব ব্যাংকের বুথে টাকা রয়েছে সেগুলোতে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে দেখা গেছে গ্রাহকদের। অন্যদিকে এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তোলা যাচ্ছে না। এতে বেশ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন গ্রাহকরা। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের পাশে স্থাপন করা সারি সারি বুথেগুলো খোলা থাকলেও গ্রাহকদের এ বুথ সে বুথ দৌড়াতে দেখা গেছে নগদ টাকার অভাবে।
রাজধানীর ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ারের সামনে সারি সারি ফাঁকা বুথ বিষয়ে ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমান নামের একজন বেসরকারী চাকরিজীবি ব্যাংক গ্রাহক বললেন, ‘তিনটা বুথ ঘুরেছি, কোথাও টাকা নেই। জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে টাকা ধার করে চলতে হচ্ছে।’
পূবালী ব্যাংকের বুথের সামনে সাবিহা আলম নামের একজন অধিবাসী বললেন, ঈদের সময় যদি এমন বিড়ম্বনার শিকার হই; তাহলে তো তাহলে এমন বুথে থাকার দরকার নেই। এটা খুবই খারাপ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো ব্যাংকগুলো।
মহাখালীর একটি পোশাক কারখানার কর্মী রুনা আক্তার বলেন, বোনকে জরুরি টাকা দেব এজন্য বুথে টাকা তুলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকটা বুথ ঘুরেও টাকা পাইনি। পরে বাসে করে মিরপুর গিয়ে টাকা তুলেছি। এতে সময় ও ভাড়া দুটোই বেশি খরচ হয়েছে।
ডাচ বাংলা ব্যাংকের গ্রাহক অঞ্জন দেব বললেন, আমার একাউন্টে টাকা আছে কিন্তু বুথ থেকে তুলতে পারছি না। টাকা তুলতে গেলেই বুথে লেখা দেখাচ্ছে আউট অফ সার্ভিস। একই ব্যাংকের বসুন্ধরা আবাসিক সংলগ্ন ফাস্ট্র ট্রাক বুথ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা উত্তোলন করতে না পারার অভিযোগ করলেন ফরিদা আক্তার নামের একজন গ্রাহক। তিনি বললেন, ৫ হাজার টাকার বেশি একবারে বুথ থেকে তোলা যাচ্ছে না। অথচ আমার একাউন্টে পর্যাপ্ত অ্যামাউন্ট ডিপোজিট আছে। এখন প্রয়োজন মেটাতে এ বুথ সে বুথ করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে নগদ টাকা তুলতে হচ্ছে।
রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, দুপুর থেকে পাঁচটি বুথ ঘুরে এক টাকাও তুলতে পারিনি। প্রতিটি বুথে “টাকা নেই” লেখা নোটিশ ঝুলছিল। অথচ নগদ টাকার খুব দরকার ছিল।
ইউসিবিএল ব্যাংকের গ্রাহক কবির জানান, তিনি দুইট বুথ ট্রাই করার পর তৃতীয়টি থেকে কিছু টাকা তুলতে পেরেছেন।
গ্রাহকদের এমন দুর্ভোগ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদুল আজহার লম্বা ছুটির কারণে বুথগুলোতে টাকা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাংক বন্ধ থাকায় বুথগুলোতে টাকা লোড করা যাচ্ছে না।’
না, এই ভোগান্তি কেবল রাজধানী নয়; বিভাগীয় ও জেলা শহরেও এর তীব্রতা কম নয়। ঈদ পরবর্তী সময়ে নগদ টাকার চাহিদা বাড়লেও অধিকাংশ বুথেই টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাংক কার্ড থাকলেও নগদ টাকা তুলতে পারছেন না অনেকে। সিলেটের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা ও সুবিদবাজার এলাকার অন্তত ১০টি বুথ ঘুরে দেখা গেছে কোনোটিতে টাকা নেই। বেশিরভাগ বুথে কারিগরি ত্রুটির কারণে লেনদেন বন্ধ লেখা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কোনো ব্যাংকের বুথে তালা ঝুলিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদেরও চলে যেতে দেখা গেছে।
জনতা ব্যাংকের গ্রাহক রুহুল আমীন বলেন, ‘ঈদের পরে নগদ টাকার জন্য জনতা ব্যাংকের বেশ কয়েকটি বুথ ঘুরেছি। কিন্তু কোথাও টাকা পাইনি। অথচ ‘বুথে টাকা নেই সেটাও কর্তৃপক্ষ বলতে নারাজ। বুথের মেশিনে কারিগরি ত্রুটি লেখা দেখে টানা দুদিন গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। টাকা নেই সেটা লিখলে তো দুইবার যেতে হতো হতো না।‘
নগরীর আম্বরখানা এলাকার একটি ব্যাংকের বুথের নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঈদের পরদিন থেকেই বুথে টাকা নেই। গ্রাহকরা এসে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ বরে গতকাল (১৩ জুন) সবচেয়ে বেশি গ্রাহক এসে ফিরে গেছেন।‘
বুথে গিয়ে টাকা না পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসছে বড় ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে। রংপুরের ডাচ বাংলা ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে একটি বেসরকারি কোম্পানির ডিলার উদয় চন্দ্র বর্মন জানান, বৃহস্পতিবার (১২ জুন) থেকে শহরের টার্মিনাল, সিও বাজার ও ধাপ সাগরপাড়া এলাকায় ঘুরেও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারেননি। অনেক জায়গায় এটিএম বুথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
রংপুর বিভাগেরই জেলা শহর লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার পূবালী ব্যাংক শাখার গ্রাহক তিতাস আলম জানান, গত তিনদিন থেকে পূবালী ব্যাংকের এটিএম বুথে কোনো লেনদেন করতে পারেননি তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ২৯ মে সার্কুলার দিয়ে ঘোষণা দেয়, ঈদুল ফিতরের আজহার ছুটিতে গ্রাহকদের নির্বিঘ্নে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ দিতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে তাদের এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা সরবরাহ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ঈদের আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এমন নির্দেশনা দেয়, যেন বুথগুলোতে পর্যাপ্ত টাকা মজুত রাখা হয় এবং সার্বক্ষণিক রিফিলের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
ছুটির মধ্যে এটিএম বুথে টাকা না থাকায় গ্রাহকদের ভোগান্তি নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় বেশ কিছু ব্যাংকের কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা জানান, এটিএম বুথ সাধারণত দুইভাবে পরিচালিত হয়—একটি হলো ব্যাংক শাখার সঙ্গে থাকা বুথ, অন্যটি আলাদা বা স্বাধীন বুথ। শাখা–সংলগ্ন বুথগুলো পরিচালিত হয় সেই শাখার মাধ্যমে। ঈদের ছুটিতে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব বুথে নতুন করে টাকা জমা দেওয়া যায়নি, কারণ শাখার সব কর্মকর্তা ছুটিতে ছিলেন। তবে কিছু ব্যাংক বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে শুধুমাত্র এটিএমে টাকা ভরার জন্য কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রেখেছে। যার ফলে কিছু বুথে টাকা থাকলেও বেশির ভাগই ছিল খালি। কিছু এটিএম বুথে ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) রয়েছে, যেখানে টাকা জমা দেওয়া ও তোলা—দুই সুবিধা থাকে। তবে এসব বুথেও টাকা না থাকায় ভোগান্তি বাড়ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, কোনো গ্রাহক সিআরএম বুথে টাকা জমা দিলেই পরক্ষণেই অন্য গ্রাহক সঙ্গে সঙ্গে তা তুলে নিচ্ছেন। জমা পড়া টাকাতেই চলছে লেনদেন। ফলে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিছু গ্রাহক সেবা পেলেও তা খুবই সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আগেই নির্দেশনা দিয়েছি যাতে প্রতিটি বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক ব্যাংক সেই নির্দেশনা মানছে না বলে অভিযোগ আসছে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ১০ দিন ছুটি থাকার বিষয়টি আমরা আগে থেকেই অবগত আছি। এই সময়ে যেন সাধারণ মানুষের নগদ টাকার ক্রাইসিস না হয় সে জন্য ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি মেশিনে পর্যাপ্ত টাকা রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। এখন যে যে কারণে সমস্যাগুলো দেখা দিলো সেগুলো আইডেন্টিফাই করে সেগুলোর যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই ব্যবস্থা নিবো। তবে ঈদের ছুটি শেষে কেন বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখা হয়নি, জনভোগান্তি তৈরি হলো সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে আমরা ব্যাংকগুলোকে ডাকবো।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, একেকটি ব্যাংকের প্রতিটি এটিএম বুথে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাখা যায়। ঈদের সময়ে এই পরিমাণ টাকা দ্রুতই ফুরিয়ে যায়। আইনগত সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত টাকা রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বুথে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি টাকা রাখা যায় না। বেশি রাখলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় তা অনিয়ম হিসেবে ধরা পড়বে। প্রয়োজনীয় বিধিমালা পরিবর্তন ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই ছুটির সময় বিশেষ ব্যবস্থায় যে টাকা লোডের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে এই সমস্যাটা এড়ানো যেতে পারে।
এছাড়াও ঈদকে সামনে রেখে প্রযুক্তিগত কৌশলেও ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে গ্রাহক ভোগান্তি ঘটে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই যেমন বুথ থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে একবারে উত্তলণ সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আবার এই সময়ে ইলেক্ট্রনিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) ডিজঅ্যাবল করে রাখাতেও গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েন। ঈদের আগে কোরবানির পশু কেনার সময়ে এমন দুর্ভোগ পোহানোর কথা জানা গেছে ব্র্যাক বাংক গ্রাহকদের। অবশ্য প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এই দুর্ভোগের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক থেকে নোটিশ দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এই সার্বজনীন নেটওয়ার্কে অন্য কোনো ব্যাংকের ওই সময়ে সমস্যা হওয়ার কথা জানা যায়নি।
ফলে ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গ্রাহক ভোগান্তি কমাতে এ ধরনের অনিবার্য ভোগান্তি হ্রাসে প্রতিটি বুথে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও জরুরি ভিত্তিতে রিফিল টিম সক্রিয় রাখার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বুথগেুলোতে পর্যাপ্ত টাকা রাখার ব্যবস্থা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। এজন্য তাদের মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সমস্যার দ্রুত সমাধান ও নগদ টাকার বিকল্প ডিজিটাল লেনদেনে মানুষকে উৎসাহিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১২ হাজার ৯৪৬ এটিএম বুথ ও ৭ হাজার ১২টি ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) রয়েছে। কিন্তু ঈদ কিংবা উৎসবকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে এসব বুথের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।







